বাংলার ফুটবলে নৈপুণ্য ছড়ানো পাঁচ ফুটবলার

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০১:৩২ এএম

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের চোখ এখন দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপে। প্রিয় দল, প্রিয় তারকার খেলা দেখে তাদের চোখে সুধা মেটাচ্ছেন। রাত জেগে খেলা দেখে প্রিয় দলের জয়ে উৎসব করছেন, আর হারলে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘুমাতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলেও দর্শক সংখ্যার কমতি নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খেলা দেখে মন ভরলেও হয়তো অনেকেই জানেন না, বাংলাদেশেও ছিলেন বিশ্বমানের ফুটবলার। যাদের খেলা দেখে, ফ্যাশন দেখে, ব্যক্তিত্ব দেখে উচ্ছ্বসিত হতেন সমর্থকরা। এ বিষয়ে লিখেছেন ওমর ফারুক রুবেল


সৈয়দ আবদুস সামাদ

ফুটবলের ড্রিবলিং জাদুকর

উপমহাদেশের ফুটবল ইতিহাসে কিছু নাম কিংবদন্তির মর্যাদা লাভ করেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম সৈয়দ আবদুস সামাদ, যিনি ‘ফুটবলের জাদুকর সামাদ’ নামে খ্যাত। অসাধারণ ড্রিবলিং, নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণ, ক্ষিপ্রগতি এবং গোল করার অনন্য দক্ষতার কারণে তিনি ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে আজও অমর হয়ে আছেন।

১৮৯৫ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ভুরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সামাদ। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে কলকাতার ফুটবল অঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯১২ সালে কলকাতা মেইন টাউন ক্লাবে যোগদানের মাধ্যমে তার ফুটবল ক্যারিয়ারের সূচনা ঘটে। পরে তিনি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন এবং দলকে একের পর এক সাফল্য এনে দেন।

সামাদের খেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার অসাধারণ ড্রিবলিং। প্রতিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল তার অসাধারণ। মাঠে তার উপস্থিতি মানেই ছিল দর্শকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। তার খেলা দেখে সমকালীন অনেক বিদেশি ক্রীড়া বিশ্লেষকও বিস্মিত হয়েছিলেন। স্কটল্যান্ডের এক ফুটবলবোদ্ধা মন্তব্য করেছিলেন, ‘সামাদ যদি ইউরোপে জন্মগ্রহণ করতেন, তবে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি পেতেন।’

১৯২৪ সালে সামাদ সর্বভারতীয় ফুটবল দলে সুযোগ পান এবং ১৯২৬ সালে অধিনায়ক নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বে দল বার্মা, সিলোন, মালয়, সিঙ্গাপুর, হংকং ও চীন সফর করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। চীনের বিপক্ষে একটি ম্যাচে ভারত ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর সামাদের চার গোলের সৌজন্যে ৪-৩ ব্যবধানে জয় লাভ করে, যা আজও ফুটবল ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা।

দেশভাগের পর সামাদ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পার্বতীপুরে বসবাস শুরু করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই অঞ্চলের মানুষের কাছে ছিলেন গর্বের প্রতীক। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, জীবনের শেষভাগে তিনি আর্থিক সংকটে ভুগেছেন এবং যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। ১৯৬৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এই কিংবদন্তি ফুটবলার মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তার ফুটবল নৈপুণ্য, নেতৃত্বগুণ এবং অসংখ্য অবিস্মরণীয় কীর্তি আজও তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে। উপমহাদেশের ফুটবল ইতিহাসে জাদুকর সামাদ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো কখনো ম্লান হওয়ার নয়।


কাজী সালাউদ্দিন

বাংলাদেশের ফুটবলের প্রথম সুপারস্টার

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যারা শুধু মাঠের সাফল্য দিয়ে নয়, ব্যক্তিত্ব, জনপ্রিয়তা ও প্রভাব দিয়ে একটি প্রজন্মকে আন্দোলিত করেছেন। সেই তালিকার শীর্ষে নিঃসন্দেহে রয়েছেন কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলাদেশে ফুটবল যখন ছিল মানুষের আবেগের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র, তখন মাঠ ও মাঠের বাইরে এক অনন্য উপস্থিতি নিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের প্রথম সত্যিকারের ক্রীড়া সুপারস্টার।

ষাটের দশকের শেষ দিকে ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হলেও স্বাধীনতার পর তার উত্থান ছিল অভাবনীয়। দ্বিতীয় বিভাগে দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে আলো ছড়ানোর পর ওয়ারী এবং পরে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন। তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয় আবাহনী ক্রীড়াচক্রের জার্সিতে। গোল করার অসাধারণ দক্ষতা, ক্ষিপ্রগতি এবং নান্দনিক ফুটবলশৈলী তাকে দর্শকদের প্রিয় খেলোয়াড়ে পরিণত করে।

সালাউদ্দিন ছিলেন এমন একজন স্ট্রাইকার, যিনি শুধু গোল করতেন না, গোলকে শিল্পে পরিণত করতেন। মাঠে তার বল নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং এবং নিখুঁত ফিনিশিং দর্শকদের মুগ্ধ করত। আবাহনীর হয়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি দলকে জয় এনে দিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে দিলকুশার বিপক্ষে এক ম্যাচে সাত গোল করার কীর্তি আজও বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে স্মরণ করা হয়।

তবে সালাউদ্দিনের জনপ্রিয়তা কেবল তার ফুটবল প্রতিভার কারণে ছিল না। দীর্ঘ চুল, আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব, আধুনিক জীবনযাপন ও স্বতন্ত্র স্টাইল তাকে সমসাময়িক অন্য খেলোয়াড়দের থেকে আলাদা পরিচয় দেয়। সেই সময়ের তরুণদের কাছে তিনি ছিলেন ফ্যাশন ও আত্মপ্রকাশের এক নতুন প্রতীক। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রথম দিকের তারকা বিজ্ঞাপন মডেল হিসেবেও তিনি পরিচিতি লাভ করেন।

জাতীয় দলের জার্সিতেও তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ এক নাম। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে খেলেছেন এবং দেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৯৭৬ সালে হংকংয়ের পেশাদার লিগে খেলার সুযোগ পেয়ে তিনি বাংলাদেশের ফুটবলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুনভাবে পরিচিত করেন।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচ এবং সংগঠক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন কাজী সালাউদ্দিন। তার নেতৃত্বে আবাহনী সাফল্য পেয়েছে, আর পরে দীর্ঘ সময় ধরে (১৬ বছর) বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নেতৃত্বও দিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে অনেক তারকার আবির্ভাব ঘটেছে, কিন্তু কাজী সালাউদ্দিনের মতো জনপ্রিয়তা, প্রভাব এবং সাংস্কৃতিক উপস্থিতি খুব কম খেলোয়াড়ই অর্জন করতে পেরেছেন। তাই বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে তিনি শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নন, বরং দেশের প্রথম ক্রীড়া সুপারস্টার হিসেবেই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।


জাকারিয়া পিন্টু

ফুটবল মাঠের অধিনায়ক, স্বাধীনতার দূত

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে অনেক তারকা এসেছেন, অনেকেই অসাধারণ নৈপুণ্যে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের অবদান কেবল খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা হয়ে ওঠেন একটি জাতির ইতিহাসের অংশ। জাকারিয়া পিন্টু ছিলেন তেমনই এক কিংবদন্তি, যার নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, গর্ব ও ভালোবাসার সঙ্গে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। বিশ্বের ইতিহাসে খুব কম উদাহরণই আছে, যেখানে একটি ফুটবল দল স্বাধীনতার আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে চ্যারিটি ম্যাচ খেলে এই দল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন এবং তহবিল সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই ঐতিহাসিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পিন্টু।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তার এই অবদান তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তবে পিন্টুর পরিচয় শুধু স্বাধীন বাংলা দলের অধিনায়ক নয়। তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার। স্টপার পজিশনে খেলে প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগকে রীতিমতো দমিয়ে রাখতেন। কঠোর মার্কিং, অসাধারণ নেতৃত্বগুণ এবং দায়িত্ববোধ তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। ঢাকা মোহামেডানের হয়ে টানা আট বছর অধিনায়কত্ব করা তার নেতৃত্বেরই প্রমাণ।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর আগে পাকিস্তান জাতীয় দলের জার্সিতেও খেলেছেন। দুই দেশের জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করা ফুটবলারদের মধ্যে তিনি অন্যতম। মাঠে তার দৃঢ়তা যেমন ছিল প্রশংসনীয়, তেমনি মাঠের বাইরেও তিনি ছিলেন শৃঙ্খলাপরায়ণ ও নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ।

ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। ব্যক্তিগত জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তও তিনি খেলার জন্য ত্যাগ করেছেন। সতীর্থদের কাছে তিনি ছিলেন ‘পিন্টু ভাই’। একজন অভিভাবক, একজন নেতা এবং একজন অনুপ্রেরণা।

রাষ্ট্রীয়ভাবে তার অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন। জীবনে স্বাধীনতা পুরস্কার ও জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। তবে সবচেয়ে বড় পুরস্কার সম্ভবত মানুষের হৃদয়ে তার স্থায়ী আসন।

২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর ইহলোক ত্যাগ করে চলে যান তিনি। জাকারিয়া পিন্টু আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং ক্রীড়াঙ্গনের গৌরবময় স্মৃতিতে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। একজন অধিনায়ক হিসেবে নয়, বরং একটি জাতির স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে তার নাম উচ্চারিত হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।


শেখ মোহাম্মদ আসলাম

ফুটবলের অবিস্মরণীয় গোলমেশিন

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়ের কথা উঠলেই যে কয়েকজন কিংবদন্তির নাম সবার আগে উচ্চারিত হয়, তাদের মধ্যে অন্যতম শেখ মোহাম্মদ আসলাম। আশি ও নব্বই দশকে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি ছিলেন গোলের অন্য নাম। অসাধারণ গোল করার ক্ষমতা, মাঠে দুর্দান্ত উপস্থিতি এবং অদম্য লড়াকু মানসিকতার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলের সবচেয়ে

সফল স্ট্রাইকারদের একজন। খুলনার সন্তান আসলাম ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করতেন। তার বড় মামা, সাবেক ফুটবলার ওয়াসিফুর রহমান, কিশোর আসলামের প্রতিভা দেখে তাকে ফুটবলে উৎসাহিত করেন। স্কুলজীবনেই ক্রীড়াক্ষেত্রে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে সিনিয়র ফুটবলে অভিষেক ঘটে তার। মজার বিষয় হলো, ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ডিফেন্ডার হিসেবে খেলতেন। পরে কোচ আব্দুর রহিম তার মধ্যে একজন দুর্দান্ত স্ট্রাইকারের সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে তাকে আক্রমণভাগে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাস।

বিজেএমসি, মোহামেডান এবং আবাহনীর জার্সিতে খেলতে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম সেরা গোলদাতা। বিশেষ করে আবাহনীর হয়ে তার সাফল্য ছিল কিংবদন্তিতুল্য। টানা কয়েক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি হ্যাটট্রিকের বিরল কীর্তিও গড়েছিলেন তিনি। আবাহনীর হয়ে সাত মৌসুমে শতাধিক গোল করে ক্লাবটির ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে রাখেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলেও ছিল তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। দক্ষিণ কোরিয়া, নেপাল, ইরান, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে গোল করেছেন তিনি। ১৯৮৩ সালের মারদেকা কাপে আর্জেন্টিনা একাদশের বিপক্ষে তার করা গোল এখনো বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। ১৯৮৯ সালে ভারতের নাগজি ফুটবল টুর্নামেন্টে আবাহনীকে শিরোপা জেতানোর পথেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ফাইনালে তার একমাত্র গোলেই শক্তিশালী সালগাওকারকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আবাহনী।

শেখ মোহাম্মদ আসলামের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল গোলের প্রতি তার অদম্য ক্ষুধা। হেড, ভলি, বাইসাইকেল কিক কিংবা দূরপাল্লার শট, সব ধরনের গোল করার অসাধারণ দক্ষতা ছিল তার। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য তিনি ছিলেন এক আতঙ্কের নাম।

১৯৯৬ সালে ফুটবলকে বিদায় জানালেও বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে তার অবদান আজও অমøান। তিন শতাধিক গোলের মালিক এই কিংবদন্তি ২০০০ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন। বাংলাদেশের ফুটবলের স্বর্ণযুগের অন্যতম নায়ক শেখ মোহাম্মদ আসলাম আজও নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক, যার নাম দেশের ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।


মোনেম মুন্না

বিস্মৃতপ্রায় এক ফুটবল মহাতারকা

বাংলাদেশ ফুটবলের ইতিহাসে কিছু নাম সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম মোনেম মুন্না। দেশের ফুটবলের সোনালি যুগের এই মহানায়ক আজও সমর্থকদের হৃদয়ে অম্লান। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে মুন্না ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। দুর্দান্ত রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘কিংব্যাক’ নামে। মাঠে তার নেতৃত্ব, দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস তাকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল। মোনেম মুন্নার খেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার আত্মবিশ্বাস, কৌশলগত দক্ষতা এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি শুধু একজন দক্ষ ডিফেন্ডারই ছিলেন না, ছিলেন একজন অনুপ্রেরণাদায়ক অধিনায়কও। আবাহনী এবং বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে তিনি সতীর্থদের কাছে ছিলেন আস্থার প্রতীক। মাঠে তার উপস্থিতি দলকে বাড়তি শক্তি জোগাত।

১৯৬৮ সালের ৯ জুন জন্মগ্রহণ করা মোনেম মুন্না অল্প বয়সেই ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট হন। ধাপে ধাপে বিভিন্ন পর্যায়ে খেলে তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। পোস্ট অফিস পাইওনিয়ার দল থেকে শুরু করে শান্তিনগর, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে খেলার পর তিনি যোগ দেন আবাহনী ক্রীড়া চক্রে। এরপর প্রায় এক যুগ ধরে আবাহনীর রক্ষণভাগের প্রধান ভরসা হিসেবে খেলেছেন। তার নেতৃত্বে দলটি বহু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে। ১৯৯৫ সালে তার অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক ফুটবল ট্রফি জয়ের স্বাদ পায়। দেশের ফুটবলের জন্য এটি ছিল এক ঐতিহাসিক অর্জন। ক্লাব ফুটবলেও মুন্না ছিলেন সমান উজ্জ্বল। ১৯৯২ সালে আবাহনী লিমিটেডের সঙ্গে ২০ লাখ টাকার চুক্তি করে তিনি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, যা সে সময়ের জন্য ছিল রেকর্ড। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইস্ট বেঙ্গলেও তিনি নিজের দক্ষতার ছাপ রেখেছিলেন। দুই বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে মোনেম মুন্না আবাহনীর ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। তবে তার জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত। ২০০৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু মৃত্যুর পরও তিনি হারিয়ে যাননি; বরং বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

মোনেম মুন্না শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক অনন্য অধ্যায়। তার সাফল্য, নেতৃত্ব এবং খেলাধুলার প্রতি নিবেদন নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য আজও অনুপ্রেরণার উৎস। বাংলাদেশের ফুটবলের স্বর্ণালী স্মৃতির সঙ্গে তার নাম চিরকাল জড়িয়ে থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত