জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং তরুণ সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন।
তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক তথ্য প্রচার এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে গণমাধ্যম ও যুবসমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে।
রোববার (২৮ জুন ২০২৬) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা: গণমাধ্যম ও যুবসমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উপাচার্য বলেন, বিশ্বে টিকে থাকার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক এ ধরনের সেমিনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্ব নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই নয়, সমগ্র বিশ্বেই দৃশ্যমান। একসময় যে গাছপালা, খাল-বিল, নদ-নদী ও জীববৈচিত্র্য আমাদের পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, তার অনেকটাই আজ বিলুপ্তির পথে। এর ফলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবেশ দূষণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং এ সংকট সৃষ্টিতে মানুষেরও দায় রয়েছে। নির্বিচারে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনসহ বিভিন্ন অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সবার মধ্যে নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে এবং পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
উপাচার্য আরও বলেন, দেশ ও পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে গণমাধ্যমকে পরিবেশ দূষণের প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের নিরপেক্ষভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের নেতৃত্বে পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম, বিশেষ করে ‘জেন-জি’ তরুণরা উদ্ভাবনী শক্তি ও ইতিবাচক পরিবর্তনের সক্ষমতা ধারণ করে। তাদের মাঠপর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করতে হবে।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকেই পরিবেশ রক্ষার কার্যক্রম শুরু করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রত্যেককে বৃক্ষরোপণ, পরিচর্যা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার শপথ নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নের মাধ্যমে আরও পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের নেতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপরও ব্যাপকভাবে পড়ছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু প্রাকৃতিক উপায়ে নয়, পরিকল্পিত নীতিমালার মাধ্যমেও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, স্থানীয় বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতাকে জাতীয় নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারক হিসেবে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।
সেমিনারে কি-নোট স্পিকার হিসেবে বক্তব্য দেন চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী শাহ ইসরাত আজমেরী।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তরুণদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তরুণদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আনার শক্তি রয়েছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তাদের আরও সক্রিয় হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃতির যথাযথ পরিচর্যা করলে প্রকৃতিও তার সম্পদ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। পাশাপাশি গণমাধ্যমকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে নির্ভুল, বস্তুনিষ্ঠ ও সময়োপযোগী তথ্য প্রচার করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। তরুণদেরও সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রধান প্রতিবেদক (কান্ট্রি) পিনাকি রায়। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যৎ সংকট নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো এসব বাস্তবতা দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং সমস্যার সমাধানে গবেষণাভিত্তিক জনমত গড়ে তুলতে সহায়তা করা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করতে বর্তমান তরুণ সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলম।
এতে বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, গবেষক এবং আগ্রহী অংশগ্রহণকারীরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনার শেষে অতিথিরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।