অধিগ্রহণ জটিলতায় ফেরত ৭৬০ কোটি টাকা

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৩:২২ এএম

ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় সরকারের কোষাগারে ফেরত গেছে ৭৬০ কোটি টাকা। আর এতে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া ৫ হাজার ১৫২ কোটি টাকার চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টও দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে যাচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরে ভূমি বরাদ্দ না হলেও আগামী অর্থবছরে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে চায় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম মহানগরীর কালুরঘাট ও বাকলিয়া এলাকায় স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের জন্য ৫ হাজার ১৫২ কোটি টাকার প্রকল্পটি গত বছরের জানুয়ারিতে একনেকে অনুমোদন পায়। এর মধ্যে ৪ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা জাইকা, ৯৫৩ কোটি টাকা সরকার ও ৩৯ কোটি টাকা চট্টগ্রাম ওয়াসার অর্থায়ন করার কথা। স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, পাইপলাইন ও সংযোগ লাইনসহ সব কাজ এই প্রকল্পের আওতায় হলেও ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণের টাকা বিদেশি সংস্থা দেয় না। দেশে এ পর্যন্ত যত প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে এবং চলমান আছে সবগুলোর ক্ষেত্রেই দাতা সংস্থা নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ দেয় কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণের খরচ সরকারকে বহন করতে হয়।

পুরো চট্টগ্রাম মহানগরীকে স্যুয়ারেজের আওতায় আনতে ৬টি ক্যাচমেন্ট জোনে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে কালুরঘাট-২ ও বাকলিয়া-৪ ক্যাচমেন্টের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য নগরীর কর্ণফুলী নদীর তীরে হামিদচর এলাকায় ৭৪ একর জায়গা চিহ্নিত করা হয়। এই ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকার আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয় এবং এর মধ্যে সরকার ৮৬১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা অনুদান এবং ১ হাজার ২৯২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে ওয়াসাকে দেবে। প্রকল্পের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ ভূমি উন্নয়ন, ক্ষতিপূরণ, সীমানা প্রাচীর, কালভার্ট ও রাস্তা নির্মাণসহ প্রভৃতি খাতে খরচ হবে। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ৭৬০ কোটি ৪২ লাখ টাকা বরাদ্দ পায় সংস্থাটি। কিন্তু এই টাকা খরচ করতে না পারায় সরকারের কোষাগারে ফেরত গেছে। গত ৬ মে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর দেওয়া চট্টগ্রাম ওয়াসার তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ারা বেগমের এক চিঠি থেকে এ তথ্য জানা যায়।

কেন ফেরত যাচ্ছে অর্থ? : অর্থ ফেরতের বিষয়ে জানতে চাইলে স্যুয়ারেজ প্রকল্পের পরিচালক ও ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী নুরুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসন ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করতে না পারায় তাদের টাকা দিতে পারেনি। ফলে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ টাকা চলতি অর্থবছরে ফেরত যাচ্ছে। তবে আগামী অর্থবছরে আবারও টাকা চাওয়া হবে এবং জেলা প্রশাসনের টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক আদেশ জারি হয়েছে ওই বছরের ১২ মে। প্রকল্প পরিচালকের নিয়োগের অফিস আদেশ জারি হয়েছে ৫ অক্টোবর এবং ভূমি বরাদ্দের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছে গত ১৬ নভেম্বর। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভূমির সরেজমিন সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে গত ১৪ মে এবং জেলা ভূমি বরাদ্দ কমিটির সভা হয়েছে গত ১৬ জুন। তাহলে সরকারের কাছ থেকে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ টাকা কি জেলা প্রশাসন গ্রহণ করতে পারবে? কিংবা কবে পারবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (ভূমি অধিগ্রহণ) মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আমরা এই ভূমি বরাদ্দের জন্য কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির কাছে পাঠাব যা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে অনুমোদন হয়ে আসবে। পরে তা ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের কাছে এলে একটি এলএ কেইস নম্বর পড়বে। সেই আলোকে যৌথ সার্ভে করে ভূমির মূল্য চূড়ান্ত করব। পরবর্তী সময়ে ওয়াসার কাছে অধিগ্রহণের টাকা চাইলে তারা টাকা দেবে। এগুলো দীর্ঘ প্রক্রিয়া।’

তাহলে ওয়াসা ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ এত আগে কেন টাকা বরাদ্দ নিচ্ছে? এর জবাবে প্রকল্প পরিচালক কাজী নুরুল আমিন বলেন, ‘এলএ কেস নম্বর পাওয়া গেলে অর্থবছরে যে টাকা বরাদ্দ পাব তা জেলা প্রশাসনের কাছে অগ্রিম দিয়ে দেব। পরে মূল্য চূড়ান্ত হওয়ার পর টাকা সমন্বয় করা হবে। কারণ সরকারের কাছ থেকে এক অর্থবছরে সব টাকা পাওয়া সম্ভব নয়। এ বছর যেহেতু এলএ কেস পড়েনি তাই আমরা টাকা দিতে পারিনি। তবে আগামী বছর আশা করি জমা দিতে পারব।’

মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য : প্রতি বছর জুন মাসের শেষে অনেক প্রকল্পের টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত যায় উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘২৩০টি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকার কাজ চলছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ ফেরত যাচ্ছে। মূলত ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে ফেরত টাকার পরিমাণই বেশি। এই টাকার মধ্যে চট্টগ্রাম ওয়াসার একটি প্রকল্পের টাকাও রয়েছে। যেহেতু বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে তাই দ্রুত অধিগ্রহণ কার্যক্রম শেষ করে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে কাজটি এগিয়ে নিতে চাই।’

কথা হয় পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের সদস্য এস এম শাকিল আখতারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় যেসব প্রকল্পের টাকা ফেরত আসছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকের যেমন দায় রয়েছে, তেমনিভাবে কাগজপত্রের ঘাটতিও ফ্যাক্টর হিসেবে রয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হলেও ৫৫ বছর পর ২০১৮ সালে সর্বপ্রথম স্যুয়ারেজ প্রকল্পের অনুমোদন পায়। ৩ হাজার ৮শ কোটি টাকার প্রকল্পটি সংশোধন হয়ে ৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ২০২৭ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে, যা ক্যাচমেন্ট এরিয়া-১ নামে পরিচিত। অপর দিকে ক্যাচমেন্ট এরিয়া-৫ (কাট্টলী) এলাকার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টটি হালিশহরের সাগরপাড়ে এক নম্বর ক্যাচমেন্ট এরিয়ার জায়গায় বাস্তবায়ন হচ্ছে। ফ্রান্সের অর্থায়নে ২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও পাইপলাইন নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নের কাজ করা হবে। এই প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ হয়েছে, ডিজাইনের কাজ চলছে। এছাড়া ক্যাচমেন্ট এরিয়া-৩ (ফতেয়াবাদ) এলাকায় বাস্তবায়ন হতে যাওয়া ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের আওতায় থাকবে অক্সিজেন, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও প্রভৃতি এলাকা। কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংকের দুই হাজার কোটি টাকার অর্থায়নে ২০৩৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে প্রকল্পটি। ক্যাচমেন্ট এরিয়া-২ (কালুরঘাট) ও ক্যাচমেন্ট এরিয়া-৪ (পূর্ব বাকলিয়া) যৌথভাবে বাস্তবায়ন হবে পূর্ব বাকলিয়া এলাকায়। সেখানেই গড়ে তোলা হবে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। জাইকার অর্থায়নে হচ্ছে প্রকল্পটি। এটি বাস্তবায়ন হলে কালুরঘাট থেকে বাকলিয়া হয়ে ফিরিঙ্গীবাজার পর্যন্ত পুরো এলাকাটি স্যুয়ারেজের আওতায় চলে আসবে। প্রকল্পটি ২০৩৩ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ক্যাচমেন্ট-৬ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় বাস্তবায়নের কাজ চলমান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত