রোদেলা প্রিয়শী ছদ্মনামের মেয়েটির বয়স ১৭। তার কথা বলার ভঙ্গি, সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্ব যে কারও দৃষ্টি কাড়বে। ছিল অসম্ভব মেধাবী। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই সে কোচিং সেন্টারে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিত অনায়াসে। বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের মেয়ে রোদেলা কেবল টাকার জন্য নয়, নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় উপার্জন শুরু করে। কিন্তু বাবা-মায়ের দূরত্ব থেকে সৃষ্ট পারিবারিক সংকট, মমতা ও বন্ধনহীনতা তাকে মাদকাসক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সম্প্রতি একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রোদেলার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। দীর্ঘ সময় আলাপচারিতায় সে শোনায় ছোট বয়সে মরণ নেশার ফাঁদে আটকা পড়ার গল্প। একই সঙ্গে শোনায় মাদকের অন্ধকার জগৎ থেকে ফিরে আসার আকাক্সক্ষার কথা।
রাজধানীর শ্যামলীর নামকরা এই মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চলছে রোদেলার মাদক-মুক্তির চিকিৎসা। এখানে রোদেলা ছাড়াও সাইফুল, রওশনা রিশি ও আরোশী রেখা ছদ্মনামের কয়েক জনের সঙ্গেও কথা হয়। নিজেদের কথা বলতে গিয়ে সবারই চোখের পানি ঝরান। জীবনে আর কখনো মাদক নেবে না বলেও শপথ নেওয়ার কথা জানান। একজন বলছিলেন, আমরাও মানুষ, আমরাও বুঝি কোন পথে আছি, কী করছি। নিজের ভুল বুঝতে পেরে রাতের পর রাত নির্জনে কান্নাকাটি করি। এই অভিশপ্ত পথ থেকে ফিরতেই রিহাব সেন্টারে রয়েছি। জানা যায়, এখানে চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন অনেক মাদকাসক্ত ব্যক্তি। এখন মাদকাসক্তদের তারাও স্বপ্ন দেখান, বোঝান জীবনের আসল সৌন্দর্য নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নয়, সৃষ্টির মধ্যেই রয়েছে।
রোদেলা প্রিয়শী জানান কীভাবে জড়িয়ে পড়লেন মাদকের নেশায়। যখন একদমই ছোট তখন বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ফলে বাবা-মার আদর থেকে তারা শুরুতেই বঞ্চিত হয়। মা দেশের একটি নামি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুবাদে বেশির ভাগ সময়ই দেশের বাইরে থাকেন। যে কয়দিন বাসায় থাকেন, কাজের মধ্যেই ব্যস্ত থাকেন। কাজের লোকেরাই তাদের দেখাশোনা করেন। এ ভাবে শুরু হয় তার ও তার একমাত্র বড় ভাইয়ের একাকিত্ব জীবন। একপর্যায়ে বড় ভাই ইংল্যান্ডে পাড়ি জমায়, এতে তার একাকিত্ব বেড়ে যায় আরও কয়েকগুণ।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন হঠাৎ এক কাজিনের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় শখের বশে সিগারেট মুখে নেয় সে। এরপর স্কুলে ক্লাসের ফাঁকে দুই বন্ধুকে ই-সিগারেট খেতে দেখে। সেও যোগ দেয় তাদের সঙ্গে। সঙ্গী বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে তারা গাজা সেবনও শিখে ফেলে। একদিন এক বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে হেরোইন সেবন করে। বাসায় ফিরে মনে হয়, এত দিনের নেশার মধ্যে ওটাই সবচেয়ে ভালো। এরপর হেরোইনের নেশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে রাজধানীর কিছু জায়গার নিজেই গিয়ে হেরোইন কিনে নিয়ে আসতে থাকে।
রোদেলা বলেন, এই বয়সে নেশার জগতে জড়িয়ে পড়ার পরও মা কখনো বুঝতে পারেননি। যদিও তিনি নিজের আরাম-আয়েশ বাদ দিয়ে চাকরি করেছেন, আমাদের জন্য উপার্জন করেছেন। জীবনে টাকার কোনো অভাব ছিল না। আম্মু বাসায় না থাকায় বাইরের খাবার খেতে হয়। মাসে ২০-২২ হাজার টাকা খাওয়ার বিল দেন। একটাই অভাব, আব্বু তো নেই-ই, আম্মুকেও সরাসরি কাছে পাই না। আদর পাই নাই। কত রাত যে নিজের ইচ্ছামতো কেঁেদছি তার কোনো হিসাব নেই। এসব আর খাব না বলে শপথ করেছি। ওই সময় আম্মুকে একটু কাছে পেলে হয়তো আর নেশায় জড়াতে হতো না। এক সময় মন-মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক কিছুতেই রাগ হতে থাকে। নিজের চেহারাটাও যেন কেমন হয়ে যায়। একপর্যায়ে মাদক নেওয়ার বিষয়টা আম্মু বুঝতে পেরে রিহাবে দিয়েছে।
রোদেলা আরও বলছিল জীবনে স্বপ্ন ছিল টাকা ইনকাম করব, জমিয়ে রাখব, মঝেমধ্যে নিজের ইচ্ছামতো ঘুরব, লং ড্রাইভে যাব। সেই ইচ্ছার ডানায় ভর করে কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষার খাতা দেখা, প্রশ্নপত্র তৈরি করা সব করতাম। সেখান থেকে মাসে ১০-১৫ হাজার টাকা আসত। কিন্তু সেন্টারের সামনে কিছু বন্ধুদের সঙ্গে সিগারেট খাওয়ায় অভিভাবকরা অভিযোগ দেওয়া শুরু করে। এরপর ওই চাকরিটা চলে যায়।
রোদেলা জানায়, এই অবস্থা থেকে সে এখন বেরিয়ে আসতে চায়। আবারও ফিরতে চায় পড়ার টেবিলে, স্বাভাবিক জীবনে। তার মতে, শিশুদের মাদকে জড়িয়ে পড়ার জন্য পারিবারিক অশান্তি, বন্ধনহীনতা এবং অভিভাবকদের নজরদারির অভাব দায়ী।
সাইফুল জানান, নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় একদিন বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে সিগারেট খান। এরপর প্রায়ই বন্ধুদের আড্ডায় সিগারেট খেতেন। ইন্টারে ঢাকার একটি কলেজে ভর্তি হয়ে মেসে ওঠেন। জীবনের বড় ভুল হয় তখনই। মেসের সবাই মিলে প্রায় নিয়মিত গাঁজা আর ইয়াবা সেবন করত। মাঝেমধ্যে মদের পার্টি হতো। আস্তে আস্তে ভয়ংকর সব মাদকের নেশায় জড়িয়ে যায়। শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যায়। একপর্যায়ে পরিবার বুঝতে পেরে রিহাব সেন্টারে ভর্তি করেন। নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসকরা জানান, সাইফুলকে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো ভর্তি করা হয়েছে।
রওশনা রিশি (৪০) উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু গৃহবধূ। স্বামী ছিলেন রাজনীতিবিদ। এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে সুখের সংসার। অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় ২০১৬ সালে স্বামী সংসার থেকে আলাদা হয়ে যান। দুই সন্তান নিয়ে মায়ের বাসায় ঠাঁই নেন। একটি এনজিওতে কর্মজীবন শুরু করেন। মোট অঙ্কের বেতনে ঢাকার বাইরেও কর্মস্থলে যোগ দেন। দুই সন্তান নানির কাছে থেকে লেখাপড়া করছিল।
তিনি জানান, প্রথম পর্যায়ে ভালোই যাচ্ছিল দিন। কিন্তু নিজে একা থাকায় আস্তে আস্তে শূন্যতা অনুভব হতে থাকেন। ২০১৭ সালের এক দিন সহকর্মীদের সঙ্গে বারে যান। ওই রাতে যেন শূন্যতা অনুভব কম হয়। দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকা যায়। এরপর থেকে প্রায়ই রাতে বারের আড্ডায় মেতে উঠতে থাকেন। আস্তে আস্তে অভ্যাসটা পরিবর্তন হয়ে ইয়াবায় জড়িয়ে যায়।
রওশনা বলেন, প্রথম দিকে পরিমিত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু একপর্যায়ে আর নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এতে চাকরিটা হুমকির মুখে পড়ে। একপর্যায়ে সংবিৎ ফিরে। অবস্থা খারাপের দিকে যাওয়ায় নিজ থেকেই এই প্রথম রিহাব সেন্টারে এসেছি। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও এই পথ থেকে আমাকে বের হতে হবে। তার মতে, মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার জন্য উপযুক্ত শিক্ষার অভাব, পারিবারিক মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলা, মাদকের সহজলভ্যতাই দায়ী।
এ বিষয়ে ঢাকা আহছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য বিভাগের সিনিয়র সাইকোলজিস্ট অ্যান্ড অ্যাডিকশন প্রফেশনাল রাখী গাঙ্গুলি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদকাসক্তি একটি মানসিক সমস্যা। মানসিক সমস্যার উপস্থিতি অনেক আসক্ত ব্যক্তির মধ্যে বিষণœতা, উদ্বেগ, একাকিত্ব, ট্রমা, আত্মমূল্যায়নের ঘাটতি, ইত্যাদি থাকে। তারা মাদককে নিজের কষ্ট কমানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু এটা ভুল।
তিনি বলেন, মাদকাসক্তি শুধু একটি অভ্যাস নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্ক ও আচরণগত ব্যাধি। অনেক সময় রিহাব সেন্টারের চিকিৎসা, আইসোলেশন একজন ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে মাদক থেকে দূরে রাখে। কিন্তু মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক কারণগুলো পরিবর্তন না হলে পুনরায় আসক্তির ঝুঁকি থেকেই যায়।