হাবিবসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদন্ড, আরও দুজনের সাজা

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৩:২৪ এএম

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনজনকে মৃত্যুদ-াদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই সঙ্গে একজনকে যাবজ্জীবন ও একজনকে ২০ বছরের কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়েছে।

দ-াদেশপ্রাপ্তরা সবাই পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা। তারা হলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক এডিসি (অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার) রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মশিউর রহমান। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন রামপুরা থানার সাবেক এসআই (উপপরিদর্শক) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। আর ২০ বছর কারাদ-াদেশ পেয়েছেন রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই (সহকারী উপপরিদর্শক) চঞ্চল চন্দ্র সরকার।

গতকাল রবিবার বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সদস্য মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনালের অনুমতি সাপেক্ষে রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ২০২৪- এর অভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকা- ও নির্যাতনের অভিযোগের বিচারে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি পঞ্চম রায় এবং ট্রাইব্যুনাল ১-এর এটি তৃতীয় রায়।

গতকালের রায়ে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে চঞ্চল সরকার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। রায় ঘোষণার সময় তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাকে আবারও কারাগারে পাঠানো হয়। আসামি মো. হাবিবুর রহমান এর আগে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায় মৃত্যুদ-ের সাজা পান। রাজধানীর চানখাঁরপুলে ৬ জনকে হত্যা মামলায় গত ২৬ জানুয়ারি তাকে মৃত্যুদ- দিয়েছিল একই আদালত।

যে সব অভিযোগে আসামিদের দ- : এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে বলা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশনায় এবং তখনকার ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের আদেশে আসামিরা নিজেদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার বাইরে গিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আক্রমণ চালান। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার দিকে বনশ্রী এইচ ব্লক জামে মসজিদের সামনে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে মো. নাদিম (৩৮) নামে এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, একই দিন বিকেলে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলি ও ধাওয়া খেয়ে বনশ্রী জামে মসজিদের পাশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেন আমির হোসেন। আত্মরক্ষায় তিনি ওই ভবনের তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের পাইপ ধরে ঝুলে ছিলেন। সেখানে এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার ও এসআই তারিকুল ইসলাম তাকে গুলি করলে তিনি গুরুতর জখম হন।

তৃতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, একই দিন বিকেলে বনশ্রী জি ব্লকে রামপুরা থানার সামনের একটি বাসার নিচতলায় গেটের ভেতরে দাদি-নাতি অবস্থান করার সময় ক্রমাগত গুলি চালালে পুলিশের একটি বুলেট শিশু মুসার মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং তার দাদি মায়া ইসলামের (৬০ বছর) পেটে বিদ্ধ হয়। পরে মায়া হাসপাতালে মারা যান।

যেভাবে বিচারের আওতায় আসামিরা : গত বছরের ৩১ জুলাই ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে ৫ আসামির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করে। একই বছরের ৭ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ২৩ অক্টোবর তখনকার চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। একই দিন প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন কার্নিশে ঝুলে থাকা গুলিবিদ্ধ যুবক আমির হোসেন।

এ মামলায় ১৪ জন সাক্ষী জবানবন্দি দেওয়ার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের জেরা করেন। চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে ও আসামি চঞ্চলের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য শেষে ২৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্কের শুনানি শুরু হয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষে গত ৪ মার্চ এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল। তবে, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে নতুন করে ‘ডিজিটাল এভিডেন্স’ জমা দেওয়া এবং অধিকতর যুক্তিতর্কের শুনানির আবেদন করা হলে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের আরজি মঞ্জুর করে।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম তখন বলেছিলেন, মামলা পর্যালোচনা করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, আসামি চঞ্চল সরকারের একটি ‘এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশনের’ (বিচারবহিবর্ভূত হত্যার স্বীকারোক্তির) ভিডিও রেকর্ড রয়েছে, যেখানে আসামি স্বীকার করেছেন কীভাবে এবং কার নির্দেশে তিনি গুলি করেছেন এবং অত্যন্ত শক্তিশালী এই প্রমাণটি আগে অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়েছিল। এরপর গত ১৫ জুন রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ২৮ জুন (গতকাল) রায়ের জন্য দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল।

রায়ে সন্তুষ্ট প্রসিকিউশন, সংক্ষুব্ধ আসামিপক্ষ : রায়ের প্রতিক্রিয়ায় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের একটি ওয়্যারলেস মেসেজ ছিল যে, তিনি তার অধীনস্থ সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন যাতে এই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে গুলি করা হয়। অপর আসামি এডিসি রাশেদের নেতৃত্বে রামপুরায় হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া চঞ্চল সরকার কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি করেন। চঞ্চল একটি ভিডিওবার্তায় এই ঘটনা স্বীকারও করেন। আসামি তারিকুল ইসলাম চঞ্চল সরকারে সঙ্গে এই গুলি করেন। অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইবুনাল আসামিদের সাজা দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সবগুলো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

২০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন সাংবাদিকদের বলেন, হঠাৎ করে সামনে আসা একটি ‘এক্সট্রা জুডিশিয়াল কনফেশন’ বা ভিডিওবার্তার ওপর ভিত্তি করে এ রায় দেওয়া হয়েছে। আমরা বারবার আরজি রেখেছিলাম যে, এই প্রমাণটি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে না। তিনি বলেন, ‘আমরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত