ধান-চাল সংগ্রহে দুর্নীতি

ভাঙতে হবে মধুচক্র

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ১১:১৩ পিএম

আমরা জানি, সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের মূল উদ্দেশ্য কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে সরকারি মজুদ গড়ে তোলা। কিন্তু এই অভিযোগ নতুন নয় মাঠপর্যায়ে প্রচারের অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে অনিয়ম-দুর্নীতির মচ্ছবের ক্ষেত্র তৈরি হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী আর অসাধু সরকারি দায়িত্বশীলদের যোগসাজশে ধান সংগ্রহ অভিযান হয় প্রশ্নবিদ্ধ। ইতিমধ্যে এ রকম অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে অনেকবার উঠে এসেছে। ২৯ জুন ফের দেশ রূপান্তরে এর আরও একটি চিত্র উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, চাঁদপুরের মতলব উত্তরের সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহ অভিযানে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে, কৃষককে হয়রানি করা হচ্ছে।

চাঁদপুরের মতলব উত্তরের ঘটনাটি আপাত দৃষ্টিতে খণ্ডিত একটি ঘটনা মনে হতে পারে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অখণ্ড চিত্র এর ব্যতিক্রম কিছু নয়। একদিকে ওই গুদামে ঘুষ না দিয়ে ধান বিক্রি করতে পারছেন না কৃষক অন্যদিকে কৃষকের অজান্তেই ধান বিক্রি দেখিয়ে একটি চক্রের টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ নিশ্চয় গুরুতর। সরকারি অসাধু দায়িত্বশীলদের ঘুষের বিনিময়ে কোনো কোনো কৃষককে কৌশলে গুদামে ধান দেওয়ার জন্য লটারিজয়ী দেখিয়ে তুঘলকি কাণ্ডের দায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতনরা এড়াতে পারেন না। এ ব্যাপারে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরের কাছে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তা দায়সারা গোছের। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকির অভাব কদাচারের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আর সরকারি গুদামে সরাসরি সাধারণ কৃষকদের বদলে ফড়িয়া ও সিন্ডিকেটের হোতারা ধান সংগ্রহ অভিযানের সরকারি ঘোষণার জন্য যেন ওঁৎ পেতে থেকে। বহু ক্ষেত্রেই লটারি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং নিবন্ধন জটিলতায় অনেক প্রান্তিক কৃষক সরকারি গুদাম পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না, তাও পুরনো অভিযোগ। মান নিয়ন্ত্রণ শর্তাবলিও অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রাহ্য করে হীন স্বার্থবাদীরা নিজেদের উদোর পূর্তি করেন। ধান-চাল সংগ্রহ মানেই যেন এক শ্রেণির জন্য ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ বনার সুযোগ। প্রকৃত কৃষকরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া সরাসরি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারেন, তা প্রশাসনের কঠোর তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে এই দাবি নানা মহল থেকে বারবার উত্থাপিত হলেও এর সুফল যে কাক্সিক্ষত মাত্রায় মেলেনি এরই দৃষ্টান্ত উল্লিখিত ঘটনাটি। চাঁদপুরের মতলব উত্তরের খাদ্য গুদামে শুধু ঘুষের হয়রানিই নয়, ঘটছে নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনাও, তা বলা হয়েছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য শুধু মতলবেই নয়, ইতিমধ্যে এ নিয়ে যেসব স্থানে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তা খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট অসাধুদের দুর্নীতিরোধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং কৃষক হয়রানির যথাযথ প্রতিবিধানে সময়ক্ষেপণ যেন না নয়। ধান-চালসহ বিভিন্ন সংগ্রহ অভিযানের নামে অনেক ক্ষেত্রে কী হয়, অভিযানসংক্রান্ত তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করে অতীতে বহুবার দেখা গেছে এর পেছনে থাকে মূলত রাজনৈতিক প্রভাব। আমরা মনে করি, মতলবের ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।

আমাদের প্রত্যাশা, এ ঘটনা খাদ্য বিভাগের টনক নাড়াবে। সংগ্রহ অভিযানের নামে কার্যত কী হয়, তা জানতে ও বুঝতে তারা তৎপর হয়ে উঠবে। অতীতে এও দেখা গেছে, সরকারিভাবে যে ধান-চাল সংগ্রহ করা হয়, এর কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুয়া কাণ্ডকীর্তি ঘটিয়ে দুর্নীতিবাজরা উৎরেও গেছেন। এর নিরসন ঘটাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতনদের কঠোর ও নির্মোহ অবস্থান নিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে কেউ যাতে অনুকম্পা না পান তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। কেউই আইন ও নিয়মের ঊর্ধ্বে নন। ভাঙতে হবে মধুচক্র। উল্লেখ্য, বড় কৃষকরা খুব কম ক্ষেত্রেই সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করেন। তারা বরং নিজস্ব উৎপাদনের অতিরিক্ত ধান বাজার থেকে সস্তায় কিনে সংরক্ষণ করেন এবং সুযোগমতো বিক্রি করে বিপুল মুনাফা পকেটস্থ করেন। আমলে রাখা দরকার, গত কয়েক দশকে কৃষিজমির কেন্দ্রীভবন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হলেও ক্ষুদ্র এবং মাঝারি কৃষকের সংখ্যা এখনো বেশি। ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের ওপরই অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই তাদের স্বার্থরক্ষায় ছাড় দেওয়া অনুচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত