আষাঢ় মাসে পেয়ারার হাটে

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০৮ এএম

নদীবেষ্টিত বরিশাল বিভাগ। এই বিভাগের পাশেই দুটো জেলা পিরোজপুর আর ঝালকাঠি। বন্ধুরা মিলে ঘুরতে গিয়েছিলাম দুই জেলার সংযোগস্থল আটঘর, কুড়িয়ানা, আদমকাঠি আর ভীমরুলী। একটু আগে-পিছে হলেই জেলা বদল। জুলাইর মাঝামাঝি থেকে আগস্টের প্রায় শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সরু খালের পানির ওপর বসে পেয়ারা বাজার। রাতের লঞ্চে চড়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। লঞ্চের ছাদে বসে আড্ডা আর বাড়ি থেকে নেওয়া খিচুড়ি সবাই মিলে কলাপাতায় করে খেয়েছিলাম। শেষ রাতে ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুমের মধ্যেই লঞ্চ ঘাটে পৌঁছনোর শব্দ পেলাম। ঘাট থেকে নেমেই রিজার্ভ গাড়িতে করে বানারীপাড়া ফেরিঘাট। সেখান থেকেই ট্রলারে ভীমরুলীর উদ্দেশে যাত্রা।

আমাদের সঙ্গে বানারীপাড়া থেকে সঙ্গী হয়েছে স্থানীয় গাইড জয়ন্ত। ফলে ট্রলার ঠিক করা, খাবারের হোটেল খোঁজা এসব নিয়ে কোনো ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ট্রলার বেশ কিছুক্ষণ চলার পর থামে কুড়িয়ানায়। এখানকার বাজারে নাশতা করার পর আবারও ট্রলারে যাত্রা শুরু। নদীর দুপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে পৌঁছালাম আটঘরে। এই আটঘরের খালেই ডিঙ্গি নৌকার হাট। শত শত ডিঙ্গি ভাসিয়ে বসে রয়েছে বিক্রেতা। পেয়ারা বিক্রির মৌসুম ঘিরেই এই হাট। সারি সারি নতুন নৌকা দেখে ভালো লাগল। বিভিন্ন জায়গা থেকে নৌকা তৈরি করে ট্রলারে করে নিয়ে আসে এখানে। আনার দৃশ্যটাও বেশ চমৎকার।

এরপরের গন্তব্য ভাসমান পেয়ারা বাজার ভীমরুলী। ট্রলার এগিয়ে চলছে স্বচ্ছ পানির সরু খালের মধ্য দিয়ে। কোথাও কোথাও দুই পাশের গাছের ডাল দুই দিকে ছড়িয়ে গেটের মতো তৈরি হয়েছে। ট্রলারের আশপাশে অনেকগুলো পেয়ারা বোঝাই নৌকাও দেখলাম। সকাল সাড়ে ৯টায় ট্রলার ভেড়ানো হলো ভীমরুলীর মন্দির ঘাটে। পাড়ে উঠে দেখি পেয়ারার চেয়ে যেন মানুষের মেলাই বেশি। অবশ্য তখনো বাজার শুরুই হয়নি। বেলা প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ বাজার জমতে শুরু করেছে। খালের দুই দিক থেকেই পেয়ারা ভর্তি ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা এসে ভিড় করতে শুরু করেছে। সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে পেয়ারা হাট জমজমাট। পেয়ারার হাট দেখতে আসা মানুষের ভিড় তো আছেই। এখনকার স্থানীয়রা পেয়ারাকে গয়া বলে। প্রতিদিন এই ভাসমান হাটে ১২ হতে ১৮শ মণ পর্যন্ত পেয়ারা বেচাকেনা হয়। আশপাশের গ্রামগুলোতে বিশাল বিশাল পেয়ারা বাগান আছে। সেখান থেকে বিক্রেতারা  নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসে। এখানে পেয়ারা বিক্রি হয় মণপ্রতি ২২০ থেকে ৩০০ টাকা। স্থানীয়রা বাণিজ্যিকভাবেই পেয়ারা বাগান করেন। আশপাশের মোট ২১টি গ্রামের ৮৫০ হেক্টর জমির ওপর ২ হাজার ২৫টি পেয়ারা বাগান রয়েছে। শুধু কুড়িয়ানা গ্রামেই ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারার বাগান আছে। গ্রামবাসীর আয়ের উৎস পেয়ারা বিক্রি। এ অঞ্চলের পেয়ারা স্বাদও বেশ ভালো। এখান থেকে হেঁটে রওনা দিলাম কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি দেখতে। আধা ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম। ভঙ্গুর অবস্থায় কালের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে জমিদার বাড়ি। রাজা কীর্তি নারায়ণের নাম অনুসারে কীর্তিপাশা। ওখানে আধা ঘণ্টা থেকে আবার ভীমরুলী বাজারে এসে ট্রলারে চেপে বসলাম বানারীপাড়ার উদ্দেশে। সেখান থেকে আবার ঢাকার পথে।

যাবেন কীভাবে

ঢাকা থেকে বরিশালের এসি বা নন-এসি বাস রয়েছে। তবে লঞ্চে ভ্রমণই আরামদায়ক। প্রতিদিন সদরঘাট থেকে রাত ৮টা হতে ৯.৩০টা পর্যন্ত বিভিন্ন কোম্পানির লঞ্চ বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। লঞ্চঘাট থেকে সিএনজি বা মোটরসাইকেলে বা নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড হতে সরাসরি বানারীপাড়া বা ভীমরুলী বাস পাওয়া যায়।

খরচ

বাস ভাড়া ৫৫০ থেকে ৭৫০ টাকা। লঞ্চে ডেকে ১৫০ টাকা। সিঙ্গেল কেবিন ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা। ডাবল কেবিন ৩০০০ টাকা। সিএনজি বা মোটরসাইকেল ভাড়া ৩৫০ টাকা। ট্রলার ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত ৩০০০ টাকা।

কোথায় খাবেন

ভীমরুলী ও কুড়িয়ানা বাজারে বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। আগে থেকে বলে রাখলে চাহিদা অনুযায়ী খাবার মিলবে।

থাকবেন কোথায়

পেয়ারার ভাসমান হাট দেখার পর যদি কেউ বরিশালের বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে চান তাহলে শহরের চকবাজারে বেশ কিছু ভালোমানের আবাসিক হোটেল রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত