জাটকা আহরণ ও বিপণনে ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৪ এএম

জাটকা (২৫ সেন্টিমিটার বা ১০ ইঞ্চির ছোট ইলিশ) আহরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা ১ জুলাই থেকে উঠে গেছে। ১ নভেম্বর শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হয়, যার ফলে এখন থেকে জাটকা আহরণ ও বিক্রিতে আর কোনো আইনি বাধা নেই।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাটকা রক্ষায় এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হয় জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে। নিষিদ্ধ সময়ে দেশের ইলিশ সমৃদ্ধ জেলাগুলোতে প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, র‌্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে। আইন অমান্যকারীর জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে

মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশে ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে গত ৩ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৫ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত উপকূলের ৭ হাজার ৩৪৩ বর্গকিলোমিটারের প্রধান প্রজননস্থলে সব ধরনের মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সারা দেশেই ইলিশের আহরণ, পরিবহন ও বিপনন নিষিদ্ধ ছিল। ঐ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সপ্তাখানেক বাদে গত ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৮ মাস জাটকা আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। জাটকা আহরণে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বঙ্গোপসাগর এলাকায় ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞাও বলবৎ হয়।

গত ৮ মাসে জাটকা আহরণ নিষেধাজ্ঞাকালীন এ সময়ে পুলিশ, নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নদ-নদীসহ অভয়াশ্রম এবং মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও মাছের আড়ৎসহ বাজারে নজরদারি করে। তবে গত কয়েকটি বছরের তুলনায় এবার জাটকা আহরণ ও তার বিপনন ছিল কিছুটা প্রকাশ্যে। সে অবস্থার মধ্যেও বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় মৎস্য অধিদফতর প্রায় ১৫ হাজার অভিযান এবং ১২শ’ মতো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে। এসব অভিযানকালে প্রায় ৪শ’ টনের মতো জাটকা আটক ছাড়াও শতাধিক টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আটক করা হয়েছে। একইসাথে প্রায় ১০ কোটি মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল এবং ২৭ হাজার মিটার অন্যান্য ক্ষতিকর জাল আটক করা হয়েছে বলে মৎস্য অধিদফতর জানিয়েছে।

মৎস্য অধিদফতরের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আট মাসের এ নিষেজ্ঞাকালীন সময়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাটকা আহরণের দায়ে প্রায় ৪১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ছাড়াও ৭ শতাধিক জেলে ও মৎস্যজীবীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে অধিদফতর। এছাড়াও সরকারি নিষোজ্ঞার অমান্যের কারণে প্রায় পৌণে ৩শ’ জেলে ও মৎস্যজীবীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ-াদেশও দেয়া হয়েছে বলে মৎস্য অধিদফতর জানিয়েছে।

.এদিকে জাটকা আহরণে নির্ভরশীল জেলেদের জন্য গত ৮ মাসের নিষিদ্ধকালীন সময়ে খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্যে উপকূলীয় ২০টি জেলার ৯৭ উপজেলার ৩ লাখ ৬১ হাজার জেলে পরিবারের জন্য প্রায় ৬০ হাজার টন চাল বরাদ্দ ও বিতরন করেছে সরকার। চার মাসে ৪০ কেজি করে এসব চাল বিতরণ করা হয়। যারমধ্যে বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার ২ লাখ ৩০ হাজার ১৮৭ জেলে পরিবারকে ৩৬ হাজার ৮২৯ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে বলে মৎস্য অধিদফতর জানিয়েছে।

গত ৮ মাসে বরিশাল অঞ্চলের ৬টি অভায়াশ্রামসহ অভ্যন্তীরণ ও উপকূলীয় নদ-নদীতে অভিযানের ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ জাটকা অবৈধ নিধন থেকে রক্ষা পাওয়ায় ইলিশ সম্পদ আরো সমৃদ্ধ হবার আশা করছেন মৎস্য বিজ্ঞানীগণ।

সমুদ্রে যাবার সময় পর্যন্ত যেসব এলাকায় জাটকা খাদ্য গ্রহণ করে বেড়ে ওঠে, সেগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ নার্সারী ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহিৃত করে দেশে ইতোমধ্যে ৬টি ‘অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করা হয়েছে। মৎস্য বিজ্ঞানীগণের সুপারিশে বরিশালের হিজলা ও মেহদিগঞ্জের লতা, নয়া ভাঙ্গনী ও ধর্মগঞ্জ নদীর মিলনস্থল পর্যন্ত, ভেদুরিয়া থেকে চর রুস্তম পর্যন্ত তেতুুলিয়া নদীর ১শ’ কিলোমিটার, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার, মদনপুর থেকে চর ইলিশা হয়ে চর পিয়াল পর্যন্ত মেঘনার শাহবাজপুর চ্যানেলের ৯০ কিলোমিটার, চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত ১শ কিলোমিটার, নড়িয়া থেকে ভেদরগঞ্জ নিম্ন পদ্মার ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত মোট ৬টি অভয়াশ্রমে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সব ধরনের আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করায়ও ইলিশসহ সব মাছের উৎপাদন বাড়ছে।

তবে মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, দেশে এখনো নিষিদ্ধ ঘোষিত কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালসহ অন্যন্য ক্ষতিকর মৎস্য আহরণ উপকরণের সাহায্যে যে পরিমাণ জাটকা আহরণ হচ্ছে, তার এক-দশমাংশ রক্ষা করা গেলেও বছরে আরো অন্তত ১ লাখ টন ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেত। মৎস্য বিজ্ঞানীগণ দেশে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালসহ অন্যান্য ক্ষতিকর মৎস্য আহরণ উপকরণের ব্যবহার বন্ধে আরো কঠোর নজরদারিসহ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত