বাংলাদেশের জন্য এখনই চাই জাতীয় আইসিটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেমওয়ার্ক

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৩ পিএম

বাংলাদেশ ডিজিটাল রূপান্তরের একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। গত এক দশকে ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন পাবলিক সার্ভিস, ডিজিটাল পেমেন্ট, প্রশাসনিক অটোমেশন এবং নাগরিক-কেন্দ্রিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে মোটামুটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এই সিস্টেমগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ, আন্তঃসংযোগযোগ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য, ব্যয়সাশ্রয়ী এবং টেকসই করে তোলা। এ কারণেই বাংলাদেশের সব সরকারি খাতের প্রযুক্তি প্রকল্পের জন্য এখনই একটি জাতীয় আইসিটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেমওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

বিচ্ছিন্নতার সমস্যা

বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে অসংখ্য সরকারি আইসিটি সিস্টেম তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রকল্পগুলো বিচ্ছিন্ন সিস্টেম হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে — যেখানে সমন্বয় সীমিত, প্রযুক্তি কাঠামো ভিন্ন, ডকুমেন্টেশন অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ইন্টিগ্রেশন ব্যবস্থা দুর্বল। এই খণ্ডিত পদ্ধতি দেশের ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেমের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর সমস্যা তৈরি করছে।

বিভিন্ন সরকারি সংস্থা প্রায়ই একই ধরনের প্ল্যাটফর্ম, মডিউল, ডাটাবেস এবং সেবা প্রদান ব্যবস্থা আলাদাভাবে তৈরি করে। এতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি তৈরি হয়। পুনর্ব্যবহারযোগ্য জাতীয় ডিজিটাল কম্পোনেন্ট তৈরির পরিবর্তে অনেক প্রকল্প নির্দিষ্ট সংস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে সরকার উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করে।

দুর্বল আন্তঃসংযোগ ও ভেন্ডর-নির্ভরতার ঝুঁকি

যখন বিভিন্ন সরকারি সিস্টেম একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না, তখন তথ্য বিনিময় কঠিন হয়ে পড়ে। নাগরিকদের একই তথ্য বিভিন্ন সংস্থায় বারবার জমা দিতে হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তারাও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সঠিক, হালনাগাদ ও সমন্বিত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হন। একটি সাধারণ এপিআই স্ট্যান্ডার্ড, ডেটা ডিকশনারি এবং ইন্টিগ্রেশন ফ্রেমওয়ার্ক ছাড়া ডিজিটাল গভর্ন্যান্স তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না।

ভেন্ডর-নির্ভরতাও একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। সোর্স কোডের মালিকানা, ডকুমেন্টেশন, ওপেন এপিআই, ডিপ্লয়মেন্ট গাইডলাইন এবং রক্ষণাবেক্ষণ নীতির জন্য স্পষ্ট মানদণ্ড ছাড়া সফটওয়্যার সিস্টেম তৈরি হলে সরকারি সংস্থাগুলো নির্দিষ্ট ভেন্ডরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে ভেন্ডর লক-ইন ব্যয় বাড়ায়, নমনীয়তা কমায় এবং ডিজিটাল সম্পদের ওপর সরকারের মালিকানা দুর্বল করে।

সাইবার নিরাপত্তা: ঐচ্ছিক নয়, বাধ্যতামূলক

সরকারি খাতের সিস্টেমগুলো প্রায়ই নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য, আর্থিক তথ্য, প্রশাসনিক রেকর্ড এবং জাতীয় পর্যায়ের অপারেশনাল ডেটা পরিচালনা করে। বিভিন্ন সিস্টেম যদি ভিন্ন ভিন্ন নিরাপত্তা পদ্ধতি অনুসরণ করে, তাহলে সামগ্রিক জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি সরকারি আইসিটি প্রকল্পে বাধ্যতামূলক সাইবার নিরাপত্তা মানদণ্ড থাকা উচিত — যার মধ্যে নিরাপদ কোডিং, এনক্রিপশন, অ্যাকসেস কন্ট্রোল, অডিট ট্রেইল, পেনিট্রেশন টেস্টিং, ইনসিডেন্ট রেসপন্স এবং ডিজাস্টার রিকভারি পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

জাতীয় ফ্রেমওয়ার্কের সাত স্তম্ভ

সমস্যাগুলো সমাধানে বাংলাদেশকে একটি বাধ্যতামূলক জাতীয় আইসিটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেমওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ফ্রেমওয়ার্ক সাতটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো উচিত:

প্রথম স্তম্ভ: স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও পুনর্ব্যবহার। ব্যবহারকারীর অথেনটিকেশন, নোটিফিকেশন সিস্টেম, পেমেন্ট ইন্টিগ্রেশন, রিপোর্টিং ড্যাশবোর্ড, নাগরিক পরিচয় যাচাই ও সার্ভিস ট্র্যাকিংয়ের মতো সাধারণ সেবাগুলো প্রতিটি প্রকল্পে আলাদাভাবে তৈরি না করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য জাতীয় মডিউল হিসেবে তৈরি করতে হবে।

দ্বিতীয় স্তম্ভ: আন্তঃসংযোগ ও ডেটা বিনিময়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি গভর্নমেন্ট সার্ভিস বাস এবং ন্যাশনাল এপিআই গেটওয়ে চালু করতে হবে। স্ট্যান্ডার্ড ডেটা ফরম্যাট, জাতীয় ডেটা ডিকশনারি এবং সম্মতিভিত্তিক ডেটা শেয়ারিং নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

তৃতীয় স্তম্ভ: জাতীয় গভর্নমেন্ট ক্লাউড অবকাঠামো। সরকারি সিস্টেমগুলোর জন্য নিরাপদ, স্কেলযোগ্য এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য হোস্টিং পরিবেশ প্রয়োজন — যা ডেটা সার্বভৌমত্ব ও ব্যাকআপ-ডিজাস্টার রিকভারি নিশ্চিত করবে।

চতুর্থ স্তম্ভ: বাধ্যতামূলক সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষা। নিরাপত্তাকে ডিজাইন পর্যায় থেকেই প্রতিটি প্রকল্পে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

পঞ্চম স্তম্ভ: স্বচ্ছ আইসিটি ক্রয় প্রক্রিয়া। শুধু সর্বনিম্ন মূল্য নয়, প্রযুক্তিগত সম্মতি, আর্কিটেকচারের মান, সাইবার নিরাপত্তা প্রস্তুতি, রক্ষণাবেক্ষণযোগ্যতা, লাইফসাইকেল ব্যয় এবং ভেন্ডরের সক্ষমতা মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ষষ্ঠ স্তম্ভ: কেন্দ্রীয় সরকারি সোর্স কোড রিপোজিটরি। সরকার-অর্থায়িত সব সফটওয়্যার প্রকল্পের সোর্স কোড, এপিআই ডকুমেন্টেশন, ডেটাবেস স্কিমা, ডিপ্লয়মেন্ট গাইড ও অডিট রিপোর্ট যথাযথ অ্যাকসেস নিয়ন্ত্রণের অধীনে একটি কেন্দ্রীয় রিপোজিটরিতে সংরক্ষণ করতে হবে।

সপ্তম স্তম্ভ: স্থানীয় আইসিটি শিল্পের উন্নয়ন। ভেন্ডর যোগ্যতায়ন, স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেশন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য মডিউল মার্কেটপ্লেস, প্রশিক্ষণ ও যৌথ গবেষণার মাধ্যমে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সম্ভাবনা

একটি শক্তিশালী জাতীয় ফ্রেমওয়ার্ক দক্ষ কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করবে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, এআই ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা অ্যানালিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ, ক্লাউড ইঞ্জিনিয়ার, প্রজেক্ট ম্যানেজার, বিজনেস অ্যানালিস্ট এবং টেকনিক্যাল সাপোর্ট পেশাজীবীদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। তরুণ প্রজন্ম শুধু আউটসোর্সিং-নির্ভর কাজ নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের জটিল প্রযুক্তি প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।

দীর্ঘমেয়াদে এই ফ্রেমওয়ার্ক বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ডিজিটাল সার্ভিস বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। সরকারি প্রকল্পে অর্জিত অভিজ্ঞতা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য মডিউল, স্থানীয়ভাবে পরীক্ষিত প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানিমুখী আইসিটি সেবা তৈরিতে সহায়তা করবে। ফলে বাংলাদেশ শুধু সফটওয়্যার আউটসোর্সিং বাজারেই নয়, বরং গভটেক, স্মার্ট সিটি, এআই, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং এন্টারপ্রাইজ অটোমেশনের মতো উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ

কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশকে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যার নাম হতে পারে ন্যাশনাল ডিজিটাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড আইসিটি ফ্রেমওয়ার্ক স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি। এই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে:

  • স্ট্যান্ডার্ড অনুমোদন ও বড় আইসিটি প্রকল্প পর্যালোচনা করা।
  • কেন্দ্রীয় কোড রিপোজিটরি নীতি পরিচালনা করা।
  • সরকারি ক্লাউড কৌশল ও এআই নীতিমালার নির্দেশনা দেওয়া।
  • সাইবার নিরাপত্তা কমপ্লায়েন্স পর্যবেক্ষণ করা।
  • ক্রয় মূল্যায়নে সহায়তা করা এবং বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের পথে এই জাতীয় আইসিটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেমওয়ার্ক একটি অপরিহার্য ভিত্তি। বিচ্ছিন্ন প্রকল্প-ভিত্তিক ডেলিভারি থেকে সরে এসে একটি সমন্বিত, নিরাপদ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং টেকসই জাতীয় ডিজিটাল আর্কিটেকচার তৈরির এখনই সময়।

 

  • লেখক: কোরিয়া প্রবাসী তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং টিকন সিস্টেম লিমিটেড-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও।
×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত