১২৫ মিনিটের পেনাল্টিতে সেনেগালের হৃদয় ভেঙে শেষ ষোলোতে বেলজিয়াম 

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৭ এএম

সিয়াটলের গ্যালারিতে তখন সেনেগালের উৎসবের আবহ। ঘড়ির কাঁটায় ৮৫ মিনিট পার, স্কোরলাইন ২-০। ডাগআউটে ইউরোপিয়ান পরাশক্তি বেলজিয়ামের বিদায়ঘণ্টা বাজছে, আর ফুটবলবিশ্ব প্রস্তুত হচ্ছে আরেকটি বড়সড় অঘটনের সাক্ষী হতে। কিন্তু নাটকের তখনও আসল অঙ্কটাই বাকি ছিল।

মাত্র তিন মিনিটে দুই গোল শোধ করে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নেওয়া এবং ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে ১২৫তম মিনিটে পেনাল্টিতে জয় ছিনিয়ে আনা; ফুটবল ইতিহাস বোধহয় এমন অবিশ্বাস্য চিত্রনাট্য খুব কমই লিখেছে। সেনেগালকে ৩-২ গোলে স্তব্ধ করে দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬ নিশ্চিত করল রুডি গার্সিয়ার শিষ্যরা।

ম্যাচের শুরু থেকেই বেলজিয়ামের রক্ষণভাগকে তটস্থ করে রেখেছিল সেনেগালের আক্রমণভাগ। সাদিও মানে ও ইসমাইলা সারের গতিতে একের পর এক সুযোগ তৈরি করছিল 'লায়ন্স অব তেরাঙ্গা'। ম্যাচের ১২ মিনিটে ইসমাইল জ্যাকবসের ক্রস থিবো কোর্তোয়া ঠিকঠাক ক্লিয়ার করতে না পারলে সার বল পোস্টে মারেন। তবে ২৫ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি। মানের দারুণ এক ক্রসে সারের হেড আবার পোস্টে লেগে ফিরে এলে, রিবাউন্ড থেকে নিখুঁত শটে গোল করে সেনেগালকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন হাবিব দিয়ারা।

১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ম্যাচের ৩২ মিনিটে কয়েকজন দর্শক মাঠে ঢুকে পড়লে খেলা কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে। বিরতির পর বেলজিয়াম যখন খাতা খোলার চড়া মূল্য খুঁজছে, ঠিক তখনই ৫১ মিনিটে মুসা নিয়াখাতের চোখধাঁধানো দূরপাল্লার পাস বুক দিয়ে নামিয়ে তিন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে কোর্তোয়াকে পরাস্ত করেন ইসমাইলা সার। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে বেলজিয়াম তখন খাদের কিনারায়।

খেলার গতি বদলাতে প্রথমার্ধের পরই অকার্যকর চার্লস ডি কেটেলিয়ারের বদলে রোমেলু লুকাকুকে মাঠে নামান কোচ রুডি গার্সিয়া। একে একে মাঠে আসেন থমাস মুনিয়ের এবং ডডি লুকেবাকিও। ম্যাচের ৮৪ মিনিটে কোর্তোয়া যদি মানের একটি নিশ্চিত শট না ঠেকাতেন, তবে গল্পটা তখনই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু নাটকীয়তার শুরু ৮৬ মিনিটে। মুনিয়েরের নিচু ক্রস থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ব্যবধান ২-১ করেন লুকাকু। এই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ৮৯ মিনিটে লিয়েন্দ্রো ট্রোসার্ডের ভাসানো ক্রসে চিতা বাঘের মতো লাফিয়ে উঠে বুলেট হেডারে সমতা (২-২) ফেরান ইউরি তিলেমানস। অথচ কিছুক্ষণ আগেই মাঠে ট্রোসার্ডের সাথে তিলেমানসের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল, যা মেটাতে হয়েছিল আরেক বদলি খেলোয়াড় নিকো রাসকিনকে। সেই ঝগড়া ভুলে দুজন মেতে ওঠেন সমতার উল্লাসে, আর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

অতিরিক্ত সময়ের ৩০ মিনিটও যখন শেষের পথে, সবাই যখন টাইব্রেকারের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনই ম্যাচের সবচেয়ে বড় ও বিতর্কিত মুহূর্তটি আসে। ১২২তম মিনিটে ডডি লুকেবাকিওর শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসার ঠিক আগমুহূর্তে, ডি-বক্সের ভেতর তিলেমানসের গোড়ালিতে আঘাত করে বসেন সেনেগালের লামিনে কামারা। মাঠের রেফারি সাইদ মার্টিনেজ প্রথমে এড়িয়ে গেলেও ভিএআর পরীক্ষার পর পেনাল্টির বাঁশি বাজান।

ম্যাচের ১২৫তম মিনিটে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দেরিতে হওয়া গোল, পেনাল্টি থেকে বল জালের ওপরের কোণায় জড়াতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি তিলেমানস। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই বেলজিয়ামের উল্লাস আর সেনেগালের হৃদয়ভাঙার কান্না একাকার হয়ে যায়। ২০১৮ সালে জাপানের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে ৩-২ ব্যবধানে জেতার পর, বিশ্বকাপে এটি বেলজিয়ামের দ্বিতীয় ঐতিহাসিক কামব্যাক। বিদায়ের বেদনায় নীল সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াউ ম্যাচ শেষে বলেন, “খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু এটাই ফুটবল।” আর খাদের কিনারা থেকে ফেরা বেলজিয়াম বস রুডি গার্সিয়া তৃপ্তির হাসি হেসে বলেন, “যতক্ষণ বিশ্বাস থাকবে, ফুটবলে সবকিছুই সম্ভব।”

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত