প্রায় ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের জটিলতা কাটছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক রায়ে। প্রায় ১৩ বছর আগে অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি) বিধিমালার জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি সংক্রান্ত বিধির অংশবিশেষ অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় দেয়।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাহ উদ্দিন দোলন ও মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী। আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রমজান আলী শিকদার। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্য মতে, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি) বিধিমালা প্রণয়ন হয়। এর আগে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের রূপরেখা প্রণয়ন সংক্রান্ত কমিটি জাতীয়করণের জন্য প্রাথমিকভাবে ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয়ের সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করে এবং এগুলো পরে জাতীয়করণ করা হয়। তবে, অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি) বিধিমালার জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি সংক্রান্ত ৯ (১) বিধির অংশবিশেষ চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল দেয়। ২০১৯ সালের ১১ মার্চ চূড়ান্ত শুনানি শেষে রায় দেয় হাইকোর্ট। রায়ে ৯ (১) বিধির অংশবিশেষ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করে হাইকোর্ট। পরে হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতির আবেদন) করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করে আপিল বিভাগ। পরে ২০২৩ সালে নিয়মিত আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিকে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরাও আপিল বিভাগে আপিল করেন।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপিল বিভাগের এই রায় সরকার ও রাষ্ট্রের পক্ষে ঘোষিত হয়েছে। ফলে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল, সেটি আর থাকল না। আইন অনুযায়ী যেটি করা হয়েছিল, সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের স্থান থাকবে ওপরে। আর অধিগ্রহণ করা বেসরকারি স্কুল থেকে যারা এসেছেন, তাদের স্থান থাকবে নিচে, এটাই এই রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো।’ তিনি বলেন, ‘আইনি জটিলতার কারণে প্রায় ৩২ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছিলেন না। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো স্থানীয় আয়োজনে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের যে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া, বদলি করার যে ব্যাপার আছে, এই মামলার কারণে এত দিন তা কার্যকর হচ্ছিল না। সরকারও নিয়োগ দিতে পারছিল না। আজকের রায়ের পর সেই জটিলতা নিরসন হবে।’
অ্যাডভোকেট রমজান আলী শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই রায়ের ফলে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জটিলতা দূর হলো এবং যারা না কী, প্রধান শিক্ষক হওয়ার যোগ্য ছিলেন তাদের পদোন্নতির পথ সুগম হলো।’
এদিকে আপিল বিভাগের এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি ১ লাখের বেশি নতুন শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে ৩২ হাজার ৫০০ জন এবং বিভিন্ন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-প্রভাষক পদে ৭০ হাজার প্রার্থী নিয়োগ পাবেন বলে জানান তিনি। গতকাল রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে ইউনেস্কো আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকালে আমার কাছে আরও একটি সুসংবাদ রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩২ হাজার ৫০০ জন প্রধান শিক্ষকের নিয়োগের বিষয়ে আপিল বিভাগ রায় ঘোষণা করেছে। আদালত আমাদের আপিল গ্রহণ করেছে এবং আমরা এখন ৩২ হাজার ৫০০ জন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করতে পারব।’