বাউল শফি ম-ল সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে লালন সাঁইজির বাণীর সুরারোপ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার শিকার হচ্ছেন। আসলেই তিনি কী বলতে চেয়েছেন, তার দাবি কতটা যৌক্তিক, এ নিয়েই কথা হয় শফি ম-লের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- তারেক আনন্দ
সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে আপনার বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। যেখানে আপনি বলেছেন, লালন সাঁইজির গানের প্রায় ৬৫ ভাগ সুর আপনার করা। এই বিষয়টি একটু স্পষ্ট করবেন, আসলে আপনি কী বলতে চেয়েছেন?
ভুল বোঝাবুঝিটা অনেক বেশি হচ্ছে। তবে আমি শুরুতেই একটা কথা স্বীকার করতে চাই, কথাটা আমার নিজের মুখে বলা উচিত হয়নি। নিজের কথা নিজে বলতে হয় না। এটা আমার এক ধরনের আবেগজনিত ভুল ছিল। আমি ১৯৮০-র দশক থেকে লালন সাঁইজির অপ্রচলিত বাণীগুলো নিয়ে নিরলস কাজ করছি। শ্রদ্ধেয় ফরিদা পারভীন আপা, ওস্তাদ মকছেদ আলী সাঁইজির প্রচলিত গানগুলো বাদে, যে গানগুলো সাধুগুরুদের মুখে মুখে ঘুরত, গবেষকদের কাছে ছিল, সেগুলোকে আমি আধুনিক শ্রোতাদের রুচির উপযোগী করে তুলে এনেছি। শেকড়ের গন্ধ বা মূল ভাব ঠিক রেখে প্রায় কয়েকশো অপ্রচলিত গানে সুরারোপ করেছি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেগুলো গ্রহণ করেছে। সেই জায়গা থেকেই আমি ‘প্রচলিত গানের তিন ভাগের দুই ভাগ’ বা ৬৫%-এর কথা বলেছিলাম, কোনো অহংকার থেকে নয়।
লালন ফকির নিজেই গান তৈরি করে সুর দিয়ে গাইতেন। আপনি যখন অপ্রচলিত বাণীগুলো সংগ্রহ করছেন, তখন কি সেগুলোর কোনো আদি সুর খুঁজে পাওয়া যায়নি?
লালন ফকির অবশ্যই সুর করে গান গাইতেন। কিন্তু আজ থেকে প্রায় দুই-আড়াইশো বছর আগের সেই সুরগুলো সময়ের বিবর্তনে এবং পরম্পরা না থাকায় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন অনেকে যেগুলোকে ‘আদি সুর’ বলে দাবি করেন, বাস্তবে সেগুলোর নিখুঁত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। বাংলা একাডেমির লালন সমগ্র খুঁজলে প্রায় ১০০০ বাণী পাওয়া যায়। যার মধ্যে বড়জোর ১০০ থেকে ১২৫টি বাণীর সুর ওস্তাদ মকছেদ আলী সাঁই বা খোদাবক্স সাঁইজির মাধ্যমে সংরক্ষিত ছিল, যা ফরিদা আপা গেয়েছেন। বাকি বিপুল সংখ্যক বাণীর কেবল লিরিক্স ছিল, কোনো সুর ছিল না। আমি সেই সুরহীন বাণীগুলোকেই গত ৪০ বছর ধরে সুর দিয়ে মানুষের সামনে হাজির করছি।
আপনার এই দীর্ঘ সাধনাকে বাদ দিয়ে কেন এই সমালোচনা তৈরি হলো বলে মনে করেন?
ভালো কাজের পেছনে কিছুটা বাধা, সমালোচনা
থাকবেই, এটা চিরন্তন সত্য। আমাদের তরুণ প্রজন্ম কিন্তু এই গানগুলোকে মন থেকে গ্রহণ করেছে। তবে আমি সমালোচকদের প্রতি কোনো ক্ষোভ রাখছি না বরং তাদের শ্রদ্ধা জানাই। তারা লিখলে আমার নিজের ভুলটা আমি শুধরে নিতে পারি। আমার ক্ষোভ নেই কারণ আমি লালন সাঁইজির গোলামি করি। আমি নিজেকে কোনো প্রতিপক্ষ বা যুদ্ধের জায়গায় দাঁড় করাতে চাই না, তাতে আমার সাধনা ও কাজের ক্ষতি হবে।
আপনার সুর করা এমন কিছু উল্লেখযোগ্য অপ্রচলিত গানের কথা যদি আমাদের পাঠকদের জন্য বলতেন।
আমি তো প্রতি রাতেই প্রায় এই সুর সৃষ্টির কাজ করি। শিল্পকলা একাডেমিতে নিয়মিত কর্মশালা করাচ্ছি। আমার নিজস্ব একাডেমিতেও প্রায় ১০০ ছাত্র-ছাত্রী এই গানগুলো শিখছে। আগামী মাসেও লন্ডনের একটি ইউনিভার্সিটিতে ওয়ার্কশপ করতে যাচ্ছি। আমার সুরারোপ করা অপ্রচলিত ও জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘অযতনে ডুবল ভরা তরাও গুরু নিজ গুণে’, ‘এসব দেখি কানার হাট বাজার’, ‘কৃষ্ণপ্রেমে পোড়া দেহ’, ‘যদি তরীতে বাসনা থাকে’, ‘কাম গোপন প্রেম গোপন’, ‘ওগো বিন্দে ললিতে’, ‘কামকে নাচাও কামে নেচো না’, ‘রাধার গুণ কত নন্দলাল জানে না’, ‘অধরাকে ধরবি যদি কই গো তারে তার’, ‘হেলায় হেলায় দিন বহে যায়’ প্রমুখ।
লালন চর্চা নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা চাওয়া-পাওয়া কী?
আমার কোনো চাওয়া বা আকাক্সক্ষা নেই। যখন দেখি আমার তৈরি করা সুর তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা মঞ্চে গাইছে এবং আমার চেয়েও তারা বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, তখন একজন পিতা যেমন সন্তানের কাছে হেরে গিয়েও আনন্দ পান, আমারও ঠিক সেই রকম ভালো লাগা কাজ করে। আমি শুধু আমৃত্যু সাঁইজির এই বাণীগুলোর সেবা করে যেতে চাই।