বরিশালে ক্যানসার চিকিৎসার স্বপ্ন নিয়ে সাত বছর আগে বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পটি এখন সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির দুষ্টচক্রে আটকে আছে। ৯৯ কোটি ৫১ লাখ টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৯ কোটি টাকায়। মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে দুই দফা। তারপরও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ, মিলছে না চালুর নির্দিষ্ট সময়সূচি। ফলে উন্নত ক্যানসার চিকিৎসার আশায় থাকা দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো রোগীকে এখনো ঢাকাসহ দূরবর্তী শহরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০১৯ সালে একনেকে অনুমোদন পায় বরিশাল ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে আড়াই একর জমিতে হচ্ছে এ হাসপাতাল। ২০২১ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ৯৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা আর শেষ করার কথা ছিল ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। এর সঙ্গে বাজেট বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৫ কোটি টাকা। এরপর দ্বিতীয় দফায় আরও ৬৫ কোটি টাকা যোগ করে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ২৩৯ কোটি টাকায়। তবু হাসপাতাল চালু হওয়ার কোনো নিশ্চিত তারিখ নেই। এদিকে শুধু হাসপাতাল নির্মাণে দেরি নয়, বিদ্যমান শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ক্যানসার চিকিৎসার অবস্থা করুণ। হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০১৫ সাল থেকে রেডিওথেরাপি মেশিন বিকল। নেই রেডিওলজি মেশিন। রেডিও টেলিথেরাপি ও ব্রাকিথেরাপি যন্ত্রও অচল পড়ে আছে বছরের পর বছর।
কোলোন ক্যানসার আক্রান্ত বরিশাল সরকারি বিএম কলেজের শিক্ষার্থী ইশিরাত জাহান ইতির বলেন, ‘ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে চিকিৎসার জন্য বারবার ঢাকায় যেতে হচ্ছে। অসুস্থ শরীরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া খুব কষ্টকর। যাতায়াত, থাকা-খাওয়াসহ চিকিৎসার খরচও অনেক। বরিশালে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতাল চালু থাকলে এত ভোগান্তি পোহাতে হতো না।’ ক্যানসার আক্রান্ত ইতি আক্ষেপ করে আরও বলেন, ‘শুনছি অনেক বছর ধরে ক্যানসার হাসপাতাল হচ্ছে, কিন্তু এখনো সেটি চালু হয়নি। একদিকে প্রকল্পের সময় বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যয়ও বাড়ছে; কিন্তু রোগীদের দুর্ভোগ কমছে না। হাসপাতালটি দ্রুত চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অনেক কষ্ট লাঘব হতো।’ ইশিরাত একা নন, দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো ক্যানসার রোগীর একই প্রত্যাশা।
হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. এএনএম মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘ক্যানসার চিকিৎসার অন্যতম প্রধান অংশ হলো রেডিওথেরাপি। সেই মেশিন না থাকায় রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। শুধু যন্ত্রপাতি নয়, জনবল সংকটও প্রকট। নেই অধ্যাপক, নেই সহকারী অধ্যাপক, মিড লেভেলের ক্যানসার রেজিস্ট্রার পদও শূন্য।’ তার ভাষায়, ‘একটি রেডিওথেরাপি মেশিন এলে এই অঞ্চলের অনেক জেলার মানুষকে আর ক্যানসার চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটতে হবে না।’
বারবার সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে বরিশাল গণপূর্ত অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম বলেন, ব্যয় আরও বাড়তে পারে। শের-ই-বাংলা মেডিকেল থেকে নতুন ক্যানসার হাসপাতালকে সংযুক্ত করতে একটি লিংক করিডর নির্মাণ করতে হবে, প্রাথমিক হিসাবে যার খরচ প্রায় ৪০ কোটি টাকা। তিনি বলেন, ‘এটি ব্যয়বহুল এবং কারিগরি দিক থেকে জটিল একটি কাজ। তাই একটু সময় লাগছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বরিশাল গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খালেদ হুসাইন বলেন, ‘ক্যানসার হাসপাতালের কাজ প্রায় শেষ। সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন হলে ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।’
বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক লোকমান হাকিম জানান, ভবন হস্তান্তরের পর অর্গানোগ্রাম অনুমোদন, আর্থিক কোড সৃষ্টিসহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।