কর্ণফুলী টানেল 

বাণিজ্যিক খাতে যাচ্ছে অতিথিশালা

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অতিথিশালা ইজারা দিতে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর আগে এটি ইজারা দিতে গত বছরে দুইবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান  করে টানেল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। এতে স্থানীয় দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব জমা পড়লেও বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীরা আগ্রহ দেখায়নি। আবার প্রতিষ্ঠানগুলো যে দর প্রস্তাব করেছে,তা সেতু কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলনের চেয়েও কম। এমন প্রেক্ষাপটে সেতু কর্তৃপক্ষ অতিথিশালাটি ইজারার জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বা=ন করেছে।

সেতু কর্তৃপক্ষ জানায়,অবকাঠামোসহ অতিথিশালাটি ইজারা দেওয়ার জন্য গত বছরের জুলাইয়ে ও পরে সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়। ইজারার মেয়াদ ধরা হয় ২৯ বছর। অতিথিশালার সব অবকাঠামো আন্তর্জাতিক মানের। এজন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জয়েন্ট ভেঞ্চার দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। 

আগের টেন্ডারে দর কম হওয়ায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেতু কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সাধারণত লিজের দরপত্রে বেশি দর পেতে দুই-একবার দেখতে হয়। এটা অনেকটা নিলামের মতো। আবার আমাদের দর প্রাক্কলনের কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ডও ঠিক করা নেই। এ ধরনের কাজের জন্য কোনো প্রাক্কলনও আমাদের শিডিউলে নেই। প্রতিদিন কতজন লোক ওখানে (অতিথিশালা) থাকবে,তাও আমরা জানি না। তারপরও আমরা একটি আনুমানিক প্রাক্কলন করেছি। আমরা চাই, এ রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব যেন সরকারের কোষাগারে জমা হয়।

দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, নির্বাচিত ইজারাদারকে অতিথিশালার সব স্থাপনা ‘যেমন আছে’ ভিত্তিতে হস্তান্তর করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী ওই সম্পত্তি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং বার্ষিক ন্যূনতম চার কিস্তিতে ভাড়া পরিশোধ করবেন ইজারাদার। অতিথিশালার রুম সার্ভিস,খাবার, ভ্রমণ, সম্মেলন, স্পা ইত্যাদি সেবা চালু করে ইজারাদার মুনাফা অর্জন করবেন এবং এসব সেবার মূল্য নির্ধারণে পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন। তবে দর্শনার্থী বাড়াতে কোনো নতুন নির্মাণ বা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য ইজারাদারকে সেতু কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্পে যে জায়গায় অতিথিশালা নির্মাণ করা হয়েছে সেটাকে বলা হয় ‘সার্ভিস এরিয়া’। প্রকল্পের শুরুতে সার্ভিস এরিয়া ছিল না। মাঝপথে তা যুক্ত করে প্রায় ৭২ একর জায়গাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে নানা স্থাপনা। পারকি সৈকত সংলগ্ন সমুদ্র ঘেঁষে গড়ে তোলা এই অতিথিশালা সাত তারকা মানের। এখানে রয়েছে একটি ভিআইপি বাংলো। অত্যাধুনিক ও সুসজ্জিত এ বাংলোটি প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের। এটি ছয় কক্ষবিশিষ্ট। আছে একটি সুইমিংপুলও। ভিআইপি এ বাংলো ছাড়াও অতিথিশালায় রয়েছে আরও ৩০টি বাংলো। রয়েছে ৪৮টি মোটেল মেস। আরও আছে কনভেনশন সেন্টার,রেস্টুরেন্টসহ অভ্যর্থনা ভবন,দোকান,ফুড কোর্ট, জিমনেশিয়াম,কনফারেন্স সুবিধাসহ অফিস স্পেস, বিনোদন এলাকা, থিয়েটার, জাদুঘর, মসজিদ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পানি শোধনাগার, পুলিশ ও ফায়ার স্টেশন, হেলিপ্যাড, টেনিস মাঠ, সড়কসহ আনুষঙ্গিক নানা অবকাঠামো।

কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছে এ বিলাসবহুল অতিথিশালা। এতে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা, যার সিংহভাগই ঋণ হিসেবে বাংলাদেশকে দিয়েছে চীন। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর কর্ণফুলী টানেল যান চলাচলের জন্য চালু করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে অলস পড়ে আছে অতিথিশালা। এটি বাণিজ্যিক খাতে ইজারা দিয়ে টানেল প্রকল্পে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ সেতু কর্তৃপক্ষের।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল চালুর পর থেকেই লোকসানে রয়েছে। টোল বাবদ যা আয় হচ্ছে,তা দিয়ে টানেলটির পরিচালন ব্যয় উঠছে না। ব্যয় মেটাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনছে টানেলটির নির্মাণকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর টানেলের ব্যয় কমিয়ে ২৩ লাখের মধ্যে আনলেও এর আগে দৈনিক ব্যয় হতো ৩৭ লাখ টাকা। টানেল দিয়ে গাড়ি চলাচল শুরু হয় ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর। শুরু থেকে চলতি বছরের ২৯ জুন পর্যন্ত গাড়ি চলেছে ৩৭ লাখের বেশি। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে টানেল পার হয়েছে তিন হাজার ৮৭৮ গাড়ি। এতে আয় হয়েছে ১০৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে আয় হয়েছে ১১ লাখের বেশি। তবে আয়ের হিসাবে ব্যয় দ্বিগুণ। টানেল প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত অতিথিশালা ইজারা দিয়ে আয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে সেতু কর্তৃপক্ষ।

সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী বলেন, অতিথিশালা নির্মাণের পর থেকে এখন পর্যন্ত চালু করা হয়নি। এটি চালুর জন্য জনবল নেই। এজন্য সরকারের সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য এটি ইজারা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১৩ জুলাই টেন্ডার জমা নেওয়া হবে। এরপর ২৯ বছরের জন্য সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে এটি ইজারা দেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত