ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিজের পরিবারের জন্য স্বপ্নের একটি বাড়ি নির্মাণ করছিলেন ফিলিস্তিনি বাসিন্দা মোহাম্মদ সালামেহ। ওই বাড়িতেই সম্প্রতি বাগদান হওয়া তাঁর ছেলের নতুন সংসার শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই একদল ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী (সেটলার) বাড়িটি দখল করে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সপ্তাহের শুরুতে ধারণ করা এবং পরে রয়টার্স যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুইতলা নির্মাণাধীন বাড়িটির ছাদে অন্তত ছয়জন সেটলার চলাফেরা করছেন। বাড়িটি একটি পাহাড়ের নিচে অবস্থিত।
সালামেহ জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেও কোনো সহায়তা পাননি। তাঁর আশঙ্কা, পশ্চিম তীরের এই বাড়িটি হয়তো আর কখনোই ফিরে পাবেন না। তাঁর ভাষ্য, আশপাশের আরও অনেক ফিলিস্তিনি বাড়ি একই পরিণতির মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, শুধু আল্লাহই জানেন কী হবে। যদি সত্যিই আইন ও শৃঙ্খলা থাকে, তাহলে তারা চলে যাবে। তারা যদি একটি বাড়ি দখল করতে সফল হয়, তাহলে একে একে বাকিগুলোও দখল করবে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্স সেটলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। তবে বৃহস্পতিবারও (২ জুলাই) তাদের একজনকে বাড়ির ছাদে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা গেছে।
রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধ পেয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তবে শুক্রবার পর্যন্ত তারা কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। একইভাবে ইসরায়েলি পুলিশও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেটলারদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জমি দখলের ঘটনা দীর্ঘদিনের। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫ লাখ ইসরায়েলি সেটলার প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির পাশাপাশি বসবাস করছেন।
ফিলিস্তিনিরা বহু বছর ধরে অভিযোগ করে আসছেন, বসতি সম্প্রসারণের কারণে তাদের কৃষিজমি নষ্ট করা হচ্ছে, সম্পত্তিতে ভাঙচুর চালানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে।
জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে গত মাসে বলা হয়, ২০২৩ সাল থেকে ফিলিস্তিনি গ্রাম ও কৃষিজমিতে ইসরায়েলি সেটলারদের হামলার ঘটনা প্রায় ১৩০ শতাংশ বেড়েছে।
সালামেহর গ্রামের নাম জালুদ। গ্রামের বাসিন্দাদের মতে, এবারকার ঘটনাটি আগের চেয়ে আরও উদ্বেগজনক, কারণ এবার একটি নির্মাণাধীন বাড়িই দখল করা হয়েছে।
গ্রাম পরিষদের প্রধান রায়েদ আল-হাজ মোহাম্মদ বলেন, তারা এখন জালুদের শেষ বাড়ি থেকে ১০০ মিটারেরও কম দূরত্বে নেমে এসেছে। সেটিও গ্রামের এক বাসিন্দার নির্মাণাধীন বাড়ি।
তিনি জানান, জালুদ গ্রাম ইতোমধ্যে অন্তত পাঁচটি বড় সেটলার হামলার শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় বাড়িঘরে আগুন দেওয়া, যানবাহন ভাঙচুর এবং গাছ উপড়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটেছে।
জাতিসংঘসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের মতে, দখলকৃত এলাকায় বেসামরিক জনগোষ্ঠী স্থানান্তর চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী অবৈধ।
তবে ইসরায়েল এ অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে। দেশটির দাবি, পশ্চিম তীর একটি বিতর্কিত অঞ্চল এবং সেখানে হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ইহুদিদের উপস্থিতি রয়েছে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের দাবি, পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা এবং পূর্ব জেরুজালেম মিলিয়েই ভবিষ্যৎ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং সেটলারদের সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রচেষ্টার অন্যতম বড় বাধা। এমনকি ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও বিভিন্ন সময়ে সেটলারদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে।
তবুও প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে বসতি সম্প্রসারণ আরও দ্রুত বেড়েছে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সরকারটি বসতি সমর্থনকারী কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
সালামেহ জানান, ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাঁর ছেলের কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিবারের আর্থিক সংকট দেখা দেয়। ফলে বাড়ির নির্মাণকাজও থেমে যায়। সেই সুযোগেই সেটলাররা বাড়িটি দখল করে নেয় বলে তাঁর অভিযোগ।
তিনি বলেন, পাশের প্রতিবেশীও একটি দুইতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। আমরা যদি এই বাড়ি হারাই, তাহলে সম্ভবত তাদের বাড়িটিও তারা দখল করবে।