হরমুজে বসছে ইরানের ‘সার্ভিস ফি’

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় ইরানের দর কষাকষির অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে হওয়া প্রাথমিক চুক্তিতে উল্লেখ আছে, প্রথম ৬০ দিন বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কোনো ফি ছাড়াই এ প্রণালি পার হতে পারবে। তবে ওই নির্দিষ্ট সময়ের পর কী নিয়ম কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির স্মরণে শোক অনুষ্ঠান ও তার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর দুই দেশের প্রতিনিধিদের আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরার কথা রয়েছে। তার আগেই হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সার্ভিস ফি বসানোর কথা জানিয়েছে ইরান। গত শনিবার বেইজিংয়ে ‘ওয়ার্ল্ড পিস ফোরাম’ (বিশ্ব শান্তি ফোরাম)-এ অংশ নিয়ে চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবদোলরেজা রহমানি ফাজলি এই পরিকল্পনার কথা জানান। একই সঙ্গে তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় যেসব দেশ ইরানকে সমর্থন দিয়েছিল, তারা এই ফি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার বা সুবিধা পেতে পারে।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু হরমুজ প্রণালির একটি অংশ আমাদের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়ে, তাই আমরা অবশ্যই সেখানে সেবা প্রদানের বিপরীতে মাশুল আদায় করব।’ তার মতে, নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, জাহাজগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং বিপুল পরিমাণ সমুদ্রযাত্রার ফলে পরিবেশের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তা মোকাবিলা করার মতো বিষয়গুলো এই সেবার আওতায় থাকবে। ফাজলি আরও জানান, এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথের জন্য নতুন ব্যবস্থাপনা তৈরিতে ওমানের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করছে ইরান। ইতিমধ্যে ইরান বেশ কয়েকবার হরমুজ প্রণালিতে ‘ফি’ বসানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই তা প্রত্যাখ্যান করলেও, ইরান নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল। তবে নতুন এই মাশুল ব্যবস্থা কবে থেকে কার্যকর হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

রাষ্ট্রদূত ফাজলি জানিয়েছেন, এটিকে কোনোভাবেই ‘ট্রানজিট টোল’ বা ‘যাতায়াত কর’ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন সাম্প্রতিক সংকটের সময়ে যেসব দেশ ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তেহরান তাদের জন্য অনুকূল বা বিশেষ শর্তের প্রস্তাব করবে। তিনি বলেন ‘কঠিন সময়ে যেসব দেশ আমাদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেছে এবং বিশেষ করে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের জন্য আমরা অবশ্যই বিশেষ সুবিধার কথা বিবেচনা করব।’ তবে কোন কোন দেশ এই বিশেষ সুবিধার আওতায় পড়বে বা কীভাবে এই নীতি বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি ইরানি রাষ্ট্রদূত। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই সংকীর্ণ প্রণালিতে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও তা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ এবং তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। পশ্চিম এশিয়ায় সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইরান সাময়িকভাবে এই প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল। এতে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দেয় এবং জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

হরমুজ ইরানের ‘পারমাণবিক অস্ত্র’ : হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দেশটির জন্য ‘পারমাণবিক অস্ত্রের’ মতোই এক শক্তিশালী হাতিয়ার বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ। তার মতে, এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাই তেহরানের কৌশলগত সক্ষমতার বড় প্রমাণ। আলি খামেনির শেষ বিদায়ে অংশ নিতে ইরান সফর শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মেদভেদেভ বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও বড় সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তেহরান বাব এল-মান্দেব প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল আটকে দিতে পারে। এমন পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন পুরোপুরি স্থবির করে দিতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

রাশিয়ার সাবেক এই প্রেসিডেন্ট ও অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা বলেন, ‘আমি আশা করি, পরিস্থিতি এত দূর গড়াবে না। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যারা যুদ্ধ ও সংঘাত উসকে দিতে চাইছে, তাদের সবারই এ বিষয় মাথায় রাখা উচিত।’ সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে তিনি বলেন, সংঘাতের চেয়ে আলোচনা বা সমঝোতা সব সময়ই শ্রেয়। তবে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হবে বলে তিনি সতর্ক করেন। বিশেষ করে তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের পুনর্গঠনে অর্থায়নের মতো বিষয়গুলোতে একমত হওয়া সহজ হবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত