বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়াচ্ছে ওপেক প্লাস

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৫ এএম

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে থাকায় এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে পুনরায় তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হতে শুরু করায় উৎপাদন আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাস। গত রবিবার (৫ জুলাই) জোটের এক অনলাইন বৈঠকে আগামী আগস্ট মাস থেকে তেলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানোর বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করা হয়েছে। জোটের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়।

অনলাইন বৈঠকে ওপেক প্লাসের সদস্যরা আগস্ট মাস থেকে দৈনিক ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। এর আগে জুন ও জুলাই মাসের জন্য একই ধরনের উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। রাশিয়ার মতো সহযোগী দেশসহ ওপেকের মূল সাতটি সদস্য রাষ্ট্র গত এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত তাদের উৎপাদন কোটা দৈনিক প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত বাড়িয়েছে।

তবে কাগজে-কলমে এই উৎপাদন বৃদ্ধির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে এর সুফল এত দিন পাওয়া যায়নি। মূলত ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে সৌদি আরব, কুয়েত ও ইরাকের মতো ওপেকের শীর্ষ সারির উৎপাদক দেশগুলো চরম বিপাকে পড়ে।

ওপেকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জোটের দৈনিক তেল উৎপাদন যেখানে ছিল ৪ কোটি ২৭ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল, তা মে মাসে নেমে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৩১ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ (ইউএই) ওপেকের অন্যান্য দেশগুলো যাতে আরও বেশি তেল রপ্তানি করতে পারে, সেজন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় জুন মাস থেকে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে শুরু করে। অবশ্য এই উৎপাদন এখনো যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে বেশ কম।

সরবরাহে এমন বিঘ্ন ঘটার পরও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের অবস্থানে নেমে এসেছে। চীন তেল আমদানি কমিয়ে দেওয়া, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের দেশগুলোর রপ্তানি বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সমন্বয়ে বৈশ্বিক কৌশলগত মজুদ থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার কারণে দামের ওপর এই নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

সুইস ব্যাংক ইউবিএস-এর বিশ্লেষক জিওভানি স্তাউনুভো বলেন, সবার প্রত্যাশা অনুযায়ী জোটের মূল সাতটি দেশ তাদের তেল উৎপাদনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া বজায় রেখেছে। এখন মূলত দেখার বিষয় হলো কত দ্রুত আরও বেশিসংখ্যক তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালী পার হতে পারছে এবং চীনসহ বৈশ্বিক বাজারে তেলের চাহিদা কত দ্রুত আগের জায়গায় ফিরে আসে।

পাশাপাশি, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পাদিত একটি সমঝোতা স্মারকও (এমওইউ) বাজার সংশ্লিষ্টদের আশ্বস্ত করেছে যে, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ খুব দ্রুতই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল বিক্রি হয়েছে প্রায় ৭২ ডলারে। এর আগে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তেলের দাম ব্যারেল প্রতি সর্বোচ্চ ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বর্তমান দাম যুদ্ধের ঠিক আগের পর্যায়ের সমান।

উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি আরও কিছু অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ওপেক প্লাস। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত এই জোট থেকে বেরিয়ে গেছে এবং ইরাক তাদের জন্য তেলের উৎপাদন কোটা বাড়ানোর দাবি তুলেছে।

বর্তমানে ওপেক প্লাসের সদস্য সংখ্যা ইরানসহ ২১টি দেশ হলেও গত কয়েক বছর ধরে মূলত সাতটি দেশই (জোট ছাড়ার আগ পর্যন্ত আরব আমিরাতসহ) প্রতি মাসের উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। ২০২৩ সালে জোটের পক্ষ থেকে দৈনিক ১৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন কমানোর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এই সাতটি দেশ (সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, কুয়েত, আলজেরিয়া, কাজাখস্তান ও ওমান)। সেই সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই সিদ্ধান্তের অংশ ছিল।

নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে বাস্তব উৎপাদনের সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং জোটের বেঁধে দেওয়া কড়া নিয়ম থেকে মুক্ত হতে গত এপ্রিলের শেষের দিকে ওপেক প্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় আরব আমিরাত, যা ১ মে থেকে কার্যকর হয়। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, আরব আমিরাতের বিদায়ের পর আগামী আগস্ট মাসের বর্ধিত উৎপাদন হিসাবের মধ্যে ধরলেও এই সাতটি দেশের কাছে আগের হ্রাসকৃত কোটার আরও প্রায় ৩ লাখ ৭৯ হাজার ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সুযোগ থাকবে।

আগস্টের এই উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পর আগামী ২ আগস্ট জোটের পরবর্তী বৈঠকে যদি সেপ্টেম্বর মাসের জন্য সমপরিমাণ তেল উৎপাদন বাড়ানোর আরেকটি ঘোষণা আসে, তবে ২০২৩ সালের উৎপাদন হ্রাসের আগের কোটায় পুরোপুরি ফিরে যেতে পারবে এই সাত দেশ।

সূত্র: রয়টার্স

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত