পাথরঘাটায় দাদনের ঋণে দিশেহারা জেলে পরিবারগুলো

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম

একদিকে সাগরে একের পর এক নিম্নচাপ অন্যদিকে ট্রলার মালিকের কাছ থেকে দাদন এবং আশঙ্কাজনকভাবে মাছ কমে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় অর্ধলাখ জেলে। ধার-দেনা ও লাখ লাখ টাকার রসদ (বাজার-সওদা) নিয়ে সাগরে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাদের। ফলে ক্রমাগত লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন জেলে পরিবারগুলো। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, উপকূলের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিল্প এখন বিলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন ট্রলার মালিক এবং ব্যাবসায়ীরা। ফলে এই ঋণের কবলে পরে জেপেরিবারের সন্তান বাবার মতো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রমজীবি হয়ে উঠছে। ফলে জেলে পরিবারগুলোর সন্তানরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একেকবার সাগরে যাওয়ার আগে ট্রলারের তেল, চাল, ডালসহ আনুষঙ্গিক বাজার-সওদা করতে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। এই টাকার বড় অংশই জেলেরা নেন ট্রলার মালিক বা আড়তদারদের কাছ থেকে ‘দাদন’ (অগ্রিম ঋণ) হিসেবে। কিন্তু সাগরে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ না মেলায় শূন্য হাতে ঘাটে ফিরতে হচ্ছে তাদের। উপকূলের এই বিশাল জনগোষ্ঠী এবং দেশের অন্যতম প্রধান এই অর্থনৈতিক খাতকে বাঁচাতে সরকারি বিশেষ প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং আপদকালীন সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।

জেলে মনির, আলম মাঝি, সাইকুল ইসলামসহ আরও অনেকে জানান, অনেক কষ্টের পর যে সামান্য মাছ পাওয়া যায়, তা বিক্রি করে আড়তদাররা শুরুতেই দাদনের টাকা কেটে নেন। ফলে জেলেদের হাতে কোনো টাকা তো থাকেই না, উল্টো ঋণের খাতা আরও দীর্ঘ হয়। এনজিওর কিস্তি ও অনাহারে কাটছে দিন। সাগরের আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই পরিবারগুলো এখন নিত্যদিনের সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। অভাবের তাড়নায় জেলেরা বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু সাগরে মাছ না থাকায় এখন সেই এনজিওর সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তি শোধ করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিস্তির টাকার জন্য প্রতিদিন তাগিদ আর সংসারের তীব্র অভাব সব মিলিয়ে এক দিশেহারা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে উপকূলের জেলে পল্লীগুলোতে। বর্তমানে অনেক জেলে পরিবারকে দিন কাটাতে হচ্ছে অনাহারে-অর্ধাহারে।

তারা আরও বলেন, অর্থনৈতিক এই চরম বিপর্যয়ের প্রভাব সরাসরি পড়ছে জেলে পরিবারের সন্তানদের ওপর। দুমুঠো ভাতের জোগান দিতে যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো এখন বিলাসিতা। ফলে অভাবের তাড়নায় জেলে পল্লীর শত শত শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে বাবার সাথে ট্রলারে বা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে, যা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বড় বিপর্যয়।

জেলেদের পাশাপাশি চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরাও। কয়েকজন ট্রলার মালিক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রকৃতির বৈরী আচরণ এবং সাগরে ঘন ঘন নিম্নচাপের কারণে জেলেরা ঠিকমতো জাল ফেলতে পারছে না। তার ওপর সাগরে এখন আগের মতো মাছও মিলছে না। লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতিবারই আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। সাগরের বর্তমান যে অবস্থা, তাতে এই মৎস্য শিল্প অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বরগুনা মৎস্যকীবি ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরে এখন কয়েক দিন পর পরই নিম্নচাপ তৈরি হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা সাগরে টিকতেই পারছে না। একেকটি ট্রলার সাগরে পাঠানোর পেছনে আমাদের লাখ লাখ টাকার বাজার-সওদা ও জ্বালানি খরচ করতে হয়। কিন্তু বুকভরা আশা নিয়ে সাগরে গিয়ে আমাদের জেলেরা ফিরছেন খালি হাতে। সাগর এখন প্রায় মাছ শূন্য হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, ক্রমাগত লোকসানের কারণে আজ ট্রলার মালিক ও জেলে উভয় পক্ষই দেউলিয়া হওয়ার পথে। সাগরে মাছ না পাওয়ায় জেলেরা আমাদের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের টাকা যেমন শোধ করতে পারছে না, তেমনি পরিবার চালাতে বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। উপকূলের হাজার হাজার জেলে পরিবার এখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে, টাকার অভাবে তাদের সন্তানদের পড়াশোনা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সাগরের যে অবস্থা, তাতে এই ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিল্প এখন বিলুপ্তির উপক্রম হয়েছে। এই বিশাল খাত ও লাখ লাখ জেলে পরিবারকে বাঁচাতে হলে সরকারকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। জেলেদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, আপদকালীন রেশন এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা না করলে এই শিল্পকে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত