চট্টগ্রামসহ সারা দেশে শিশুর ওপর সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। গত এক মাসের মধ্যে ঢাকার পল্লবীর শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলা এবং চট্টগ্রামের দুটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় দেয় আদালত। এর ফলে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আইনজ্ঞরা মনে করেন, এসব মামলার দ্রুত রায়ের ফলে সমাজে অপরাধ কমে আসবে এবং ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় আজ মঙ্গলবার মাত্র ১৩ কার্যদিবসের মাথায় আলোচিত শিশু জান্নাতুল নেসা ওরফে ইরা মনি (৭) হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করবে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় অভিযুক্ত একমাত্র আসামি বাবু শেখ। ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী আব্বাস হোসেন জানান, ‘চাঞ্চল্যকর ইরা মনি হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার রায় ঘোষণা হবে। আসামি বাবু শেখের বিরুদ্ধে চার্জগঠন থেকে যুক্তিতর্ক মাত্র ১০ কার্যদিবসে শেষ হয়েছে।’
এদিকে গতকাল সোমবার খাগড়াছড়ির রামগড়ে দ্বিতীয় শ্রেণির এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের দায়ে আসামি শাহিনকে মৃত্যুদ- দিয়েছে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। এক বছরের মধ্যে এ মামলার রায় হলো। রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি সৃজনী ত্রিপুরা বলেন, ‘ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল দ্রুত রায় দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ রায়ের ফলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারটি ন্যায়বিচার পেয়েছে।’
এর আগে গত ১৭ জুন চট্টগ্রামে দুটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় দেয় দুটি পৃথক আদালত। চট্টগ্রাম নগরের দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডে আলিনা ইসলাম আয়াতকে (৫) হত্যার পর মরদেহ ছয় টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার মামলায় আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদন্ড দেয় আদালত। একই দিন নগরের বাকলিয়ায় চার বছরের এক শিশু ধর্ষণের মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর মাত্র অষ্টম কার্যদিবসে এবং মামলা দায়েরের ২৬ দিনের মাথায় একমাত্র আসামি মনির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছে চট্টগ্রামের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত ৭ জুন ঢাকার পল্লবীর শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করে একটি আদালত। ঘটনার ১৯ দিনের মধ্যে মামলাটি রায় দেওয়া হয়। প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়।
আইনজ্ঞদের অভিমত, দেশে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা বা শিশু হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান গতি এসেছে। আলোচ্য মামলাগুলো অল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন, দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল, স্বল্প সময়ে সাক্ষ্যগ্রহণ এবং রায় ঘোষণার ঘটনা বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলোর মধ্যে নতুন আশা সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রামের মানবাধিকার আইনজীবী জিয়া হাবিব আহসান বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আলোচিত শিশুর ওপর সহিংসতা, ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা মামলাগুলোতে তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন ও আদালতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ফলে বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তবে বিচারিক আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তি হলেও সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে রায় কার্যকরে দীর্ঘ সময় লাগছে। দ্রুত রায় কার্যকরের বিষয়ে উচ্চ আদালতে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য রাষ্ট্রপক্ষকে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নয়, বরং সব মামলায় একই ধরনের গতি ও মান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।