দেশের ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত বা অলস অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ঋণখেলাপির পরিমাণ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ধীরগতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে আগ্রহ হারাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ২ কোটি টাকা। ছয় মাস পর ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ৯২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। এরপর চলতি বছরের মে মাসে তা ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
অর্থাৎ দেড় বছরের ব্যবধানে অলস অর্থ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য সম্পদ ৭ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি রয়েছে অবাধ সরকারি অনুমোদিত সিকিউরিটিজ মূলত ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডে। ফলে ব্যাংকগুলো অলস অর্থ নগদ হিসেবে ফেলে না রেখে ঝুঁকিমুক্ত আয়ের জন্য সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করছে।
ব্যাংকারদের মতে, ঋণ বিতরণ করে খেলাপির ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ এখন বেশি নিরাপদ ও লাভজনক। এসব সিকিউরিটিজ থেকে নিশ্চিত মুনাফা মিলছে, অন্যদিকে ঋণ খেলাপির ঝুঁকিও নেই। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে। চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এক বছর আগে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকগুলো যখন ঋণ বিতরণ কমিয়ে দেয়, তখন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কার্যকর মূলধন সংগ্রহে সমস্যায় পড়ে। এর ফলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। তাদের ভাষায়, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপুল অলস অর্থ জমে থাকা আর বাস্তব অর্থনীতিতে ঋণের সংকট এটি আর্থিক শক্তিমত্তার নয়, বরং গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার লক্ষণ। অন্যদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে অনীহার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। বর্তমানে মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ শতাংশেরও বেশি খেলাপি, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ বলে মনে করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রায় ২০টি ব্যাংক কার্যত নতুন ঋণ বিতরণ বন্ধ করে দিয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোও কঠোর যাচাইবাছাই ছাড়া নতুন ঋণ অনুমোদন করছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়কালের মুদ্রানীতি বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য সমভাবে বণ্টিত নয়। সুশাসনসম্পন্ন কিছু ব্যাংকে বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থ জমা থাকলেও অন্যদিকে বেশ কয়েকটি ব্যাংক তীব্র তারল্য সংকটে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও বলেছে, বেসরকারি খাতে ঋণের দুর্বল চাহিদা, আমানতের উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ কার্যক্রমের মন্থরগতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর ফলেই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আজ আবার বসছে সংসদ অধিবেশন