ঠিক এক বছর আগের কথা। কায়রোর এক শ্রমজীবী পরিবারের এই কিশোরের দিন কাটত বাসের ধকল আর কাকডাকা ভোরের হাড়ভাঙা খাটুনির অনুশীলনে। অথচ আজ, ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের মহাবৈপ্লবিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই কিশোরের দিকেই তাকিয়ে ফুটবল বিশ্ব। নাম তার হামজা আবদেলকরিম। বয়স মাত্র ১৮ বছর ১৬৫ দিন। দেশের প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে যার এখনো একটি ম্যাচ খেলারও অভিজ্ঞতা হয়নি, সেই অনাবিষ্কৃত রত্নই এখন মিসরের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ অভিষিক্ত খেলোয়াড়।
আজ আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ ম্যাচে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হচ্ছে ফারাওরা। আর এই মহারণের আগে লাইমলাইটে থাকা মোহামেদ সালাহ কিংবা ওমর মারমুশকে ছাপিয়ে স্পটলাইট কেড়ে নিয়েছেন মিসরের নতুন ‘নম্বর ৯’।
২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি কায়রোতে জন্ম নেওয়া হামজা বড় হয়েছেন আল আহলির যুব অ্যাকাডেমিতে। তার উল্কাবেগে উত্থান এতটাই অবিশ্বাস্য যে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সবাইকে চমকে দিয়ে কাতালান জায়ান্ট এফসি বার্সেলোনা তাকে আল আহলি থেকে ধারে স্পেনে উড়িয়ে নিয়ে আসে। ব্যুরোক্র্যাটিক বা কাগজপত্রের জটিলতায় মার্চ পর্যন্ত মাঠে নামতে না পারলেও, স্প্যানিশ যুব লিগে (জুভেনিল এ) সুযোগ পেয়েই নিজের জাত চেনান হামজা। মাত্র ১১ ম্যাচে করেন ৮ গোল, যার মধ্যে মনিকার্লোর বিপক্ষে মাত্র ১৫ মিনিটে করা একটি অতিমানবীয় হ্যাটট্রিকও ছিল। ফেয়েনুর্ডকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বার্সা কর্তৃপক্ষ আর দেরি করেনি; ১.৫ মিলিয়ন ইউরো ফিক্সড এবং ৫ মিলিয়ন ভ্যারিয়েবলসের বিনিময়ে পাকাপাকিভাবে কিনে নেয় এই মিসরীয় সেনসেশনকে। আগামী মৌসুমে বার্সা আতলেতিকে হুলিয়ানো বেলেত্তির অধীনে তার আরও পরিপক্ব হওয়ার কথা।
অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে দুটি গোল করা হামজার এই প্রতিভা চোখ এড়ায়নি মিসরের সিনিয়র দলের কোচ হোসাম হাসানের। সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি তাকে বিশ্বকাপের মূল স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচের ৭৫ মিনিটে যখন মহাতারকা সালাহ মাঠ ছাড়ছিলেন, তার বদলি হিসেবেই বিশ্বমঞ্চে পা রাখেন হামজা। গড়েন মিশরের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলোয়াড়ের রেকর্ড। ম্যাচ শেষে ইনস্টাগ্রামে উচ্ছ্বসিত হামজা লেখেন, "বিশ্বকাপে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারা এক পরম গৌরব।"
হামজার খেলার ধরন প্রথাগত স্ট্রাইকারদের মতো নয়। সে কেবল ডি-বক্সের ভেতর বলের জন্য ওত পেতে থাকে না, বরং প্রতিপক্ষের মিডফিল্ড ও ডিফেন্সের মাঝখানের ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করে আক্রমণ শানাতে ওস্তাদ। প্রথম টাচেই নিখুঁত ফিনিশিং এবং কম জায়গায় অবিশ্বাস্য গতি তাকে অনন্য করে তুলেছে। বার্সেলোনার মূল দলের কোচ হ্যান্সি ফ্লিক ইতিমধ্যেই রবার্ট লেভানডোভস্কির বিদায়ের পর প্রাক-মৌসুমের পরিকল্পনায় হামজাকে রাখার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন।
যদিও চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত চার ম্যাচের প্রতিটিতেই বদলি হিসেবে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট করে খেলার সুযোগ পেয়েছেন হামজা, তবে তার আত্মবিশ্বাস আকাশচুম্বী। আজ শেষ ষোলোর লড়াইয়ে বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা কিংবদন্তি লিওনেল মেসির মুখোমুখি হওয়া প্রসঙ্গে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মুন্দো দেপোর্তিভো-কে হামজা সরাসরি জানিয়ে দেন, "আমরা আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে খেলছি, মেসির বিরুদ্ধে নয়।"
নিজের খেলার প্রতি মনোযোগ ধরে রেখে হামজা বলেন, "আমি যখন মাঠে নামি, যা আমাকে আনন্দ দেয় আমি সেটাই করি। মাঠের বাইরে কে কী বলল বা করল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার পুরো ফোকাস শুধুই মাঠের খেলায়।"
দলের প্রাণভোমরা মোহাম্মদ সালাহর কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শিখছেন এই তরুণ। সালাহ সম্পর্কে হামজার শেষ কথাটিই বলে দেয় তার স্বপ্ন কতটা আকাশছোঁয়া, "সালাহর মতো ক্যারিয়ার থাকাটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। উনার পাশে থাকাটাই আমার জন্য একটা স্বপ্ন এবং পরম সম্মান।"