রেকর্ড বৃষ্টিতে থইথই চট্টগ্রাম

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৯ এএম

রেকর্ড বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে চট্টগ্রামবাসী। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতার। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন অফিসগামী যাত্রী ও সাধারণ মানুষ। বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্থগিত করা হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাস-পরীক্ষা। দেওয়াল ও পাহাড়ধসে নগরী ও উপজেলায় প্রাণ হারিয়েছেন দুজন। আহত হয়েছেন দুই শিশুসহ পাঁচজন। অন্যদিকে বৃষ্টির পানিতে রেললাইন তলিয়ে গিয়ে মাঝপথে আটকা পড়েছে কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিপর্যয় হয়েছে। অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় অবতরণ করেছে তিনটি ফ্লাইট। এদিকে জলাবদ্ধতাপ্রবণ ও পাহাড়ঘেঁষা এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন শেষে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রামে মৌসুমের রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ বৃষ্টির কারণে যাতে নগরবাসী দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে না পড়েন, সে লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছি। আমি নিজে মাঠে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’

তিনি বলেন, বর্তমানে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং এর সুফল ইতিমধ্যে নগরবাসী পাচ্ছেন। তবে অবশিষ্ট প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ, বিশেষ করে হিজড়া খাল, জামালখান খাল ও গুলজার খালের কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়ে গেছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারী চাপের তারতম্যের আধিক্যের কারণে এ বৃষ্টিপাত। এর আগে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল ৪১২ মিলিমিটার। অন্যদিকে ঢাকা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা একেএম নাজমুল হক বলেন, বুধবার থেকে চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত একটু কমতে পারে। তবে দেশের অন্যান্য এলাকায় বাড়তে পারে।

কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরসমান : মৌসুমি স্থল নিম্নচাপের কারণে চট্টগ্রাম নগরীতে রবিবার সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। সোমবার তা অতিভারী বর্ষণের রূপ নেয়। সোমবার দিনভর বৃষ্টির পর রাতেও চলে মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টিপাতের এ ধারা অব্যাহত থাকে মঙ্গলবার দিনভর। এতে নগরীর চকবাজার, কাতালগঞ্জ, শোলকবহর, রহমতগঞ্জ, বাকলিয়া, চাঁন্দগাঁও, কাপাসগোলা, ফরিদারপাড়া, জিইসি, আগ্রাবাদ, কুসুমবাগ, হালিশহরের ‘কে’ ও ‘এল’ ব্লকের সোনালি আবাসিক, বসুন্ধরা আবাসিক, রামপুর, চৌমুহনী, আনিন্দ্যপুর, বড়পোলসহ বিভিন্ন এলাকায় কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে যায়। অনেক বাসাবাড়ি ও দোকানের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা। জলাবদ্ধতার কারণে অফিসগামী মানুষের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। গণপরিবহন সংকটে অনেককে প্যান্ট গুটিয়ে, জুতা হাতে নিয়ে পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। ফলে অনেক কর্মজীবী নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। গণপরিবহন ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে এ সময় দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করতেও দেখা যায়।

আজগর হোসেন নামে এক চাকরিজীবী বলেন, আমার অফিস আগ্রাবাদ এলাকায়। সকাল থেকে সেখানে হাঁটুসমান পানি জমেছে। পানির কারণে অফিসে ঢুকতে কষ্ট হচ্ছে। জান্নাতুল ফেরদৌস এশা নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, খুলশীর কুসুমবাগ আবাসিক এলাকায় আমাদের বাসা। সেখানে পানি উঠে গেছে। বাসা থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। আগ্রাবাদের ব্যবসায়ী ওবায়দুল করিম বলেন, সকালের বৃষ্টিতেই দোকানে পানি ঢুকে কিছু মালামাল নষ্ট হয়েছে। এমনিতেই বেচাকেনা নেই, তার উপর এখন মালামাল নষ্ট হয়ে গেল।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা : ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) অধীনে থাকা ৪৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ নগরীর অধিকাংশ বিদ্যালয়ে পূর্বনির্ধারিত অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে পরীক্ষা কমিটির সুপারিশে মঙ্গলবারের পরীক্ষা স্থগিতের এ সিদ্ধান্ত নেয় চসিক কর্তৃপক্ষ। চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা কিসিঞ্জার চাকমা দেশ রুপান্তরকে বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী মঙ্গলবারের পরীক্ষাটি স্থগিত করা হয়েছে। এই পরীক্ষা পরবর্তী সুবিধাজনক সময়ে নেওয়া হবে।

কোথাও সড়ক ভেঙেছে, কোথাও ভেঙে পড়েছে গাছ : চট্টগ্রাম নগরীতে অতি ভারী বর্ষণে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার পাশাপাশি কোথাও সড়ক ভেঙেছে। কোথাও গাছ ভেঙে পড়েছে সড়কের ওপর। নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় উড়ালসড়ক নির্মাণের জন্য তৈরি করা বাইপাস সড়কটি ভেঙে পড়ে। ভারী বৃষ্টিতে সোমবার রাতে সড়কটি ভেঙে যায়। এতে সড়কটির এক পাশ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে অন্য পাশ দিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে যান চলাচল করে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বলেন, পতেঙ্গায় আউটার রিং রোডের সঙ্গে একটি উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ চলছে। এ জন্য একটি বাইপাস সড়ক করা হয়েছিল। সেটি ভেঙে গেছে। তবে এখন মেরামত করা হচ্ছে। এদিকে ভারী বর্ষণে নগরীর এনায়েত বাজার এলাকার একটি শতবর্ষী গাছ ভেঙে পড়েছে। এতে কয়েকটি বসতঘর, গোয়ালঘর, টয়লেট, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দেওয়ালধসে মাছ ব্যবসায়ী নিহত, আহত পরিবারের ৩ সদস্য : টানা বৃষ্টির মধ্যে পূর্ব নাসিরাবাদে একটি সীমানা দেওয়ালধসে শফিকুল রহমান (৩০) নামের এক মাছ ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে নগরীর পূর্ব নাসিরাবাদ রহমাননগর আবাসিক এলাকার ‘বি’ ব্লকের ৪ নম্বর রোডে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শফিকুলের শাশুড়িসহ একই পরিবারের দুই শিশু গুরুতর আহত হয়েছে।নিহত শফিকুল রহমান গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বজ্ররা হলদিয়া গ্রামের সমীরের ছেলে। তিনি রহমাননগর ‘বি’ ব্লকের ওই সড়কের ‘সুফিয়া ভিলা’ নামে একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। তিনি স্থানীয় বাজারে মাছের ব্যবসা করতেন।

আহত ব্যক্তিরা হলেন নিহত শফিকুলের শাশুড়ি মর্জিনা বেগম (৫৬), তার চার বছর বয়সী ছেলে সোহান ইসলাম ও দুই বছর বয়সী মেয়ে সাইফা আক্তার।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিকেলে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়লে রহমাননগর আবাসিক এলাকার একটি সীমানা দেওয়াল হঠাৎ ধসে পড়ে। এতে দেওয়ালের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান শফিকুল। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তারা ধ্বংসস্তূপ থেকে আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠান।

নগরীর পাঁচলাইশ থানার ওসি জাহেদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, রহমাননগরে দেওয়ালধসে একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নিহতের শাশুড়ি ও দুই বাচ্চা আহত হয়েছেন। ঘটনার পর পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারকাজ চালিয়েছে।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিপর্যয়, নামতে পারল না ৩ ফ্লাইট : এদিকে অতিভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি। এর মধ্যে দুটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চট্টগ্রামে নামতে না পেরে পুনরায় ঢাকায় ফিরে গেছে।

এ ছাড়া বৈরী আবহাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের প্রায় সব ফ্লাইটের সময়সূচি বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রতিটি ফ্লাইট আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বিলম্ব অবতরণ ও উড্ডয়ন করছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিএস-৩৫০ (আবুধাবি-চট্টগ্রাম) ফ্লাইটটি প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামে অবতরণ করতে ব্যর্থ হয়। পরে সেটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে অবতরণ করানো হয়। একই কারণে এয়ার অ্যারাবিয়ার জি-৯-৫২৬ (শারজাহ-চট্টগ্রাম) ফ্লাইটটিও চট্টগ্রামে নামতে না পেরে ঢাকায় চলে যায়।

এ ছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-১২১ (ঢাকা-চট্টগ্রাম) অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটটি শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে পুনরায় ঢাকায় ফিরে যায়।

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল বলেন, টানা ভারী বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিমান চলাচলে সাময়িক বিঘœ সৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় আজ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের প্রায় সব ফ্লাইটের সময়সূচি বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রতিটি ফ্লাইট আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বিলম্বে অবতরণ ও উড্ডয়ন করেছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হলে ফ্লাইট পরিচালনা স্বাভাবিক হবে।

রেললাইনে পানি, সাড়ে ৬০০ যাত্রী নিয়ে চট্টগ্রামে আটকে ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ : টানা অতিভারী বর্ষণে রেললাইন ডুবে যাওয়ায় কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর এলাকায় আটকে পড়েছে। ট্রেনটিতে সাড়ে ৬০০ যাত্রী রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে ট্রেনটি আটকা পড়ে। বিকেল সোয়া ৫টা পর্যন্ত ট্রেনটি কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হতে পারেনি বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।

ষোলশহর স্টেশনমাস্টার আরিফুল ইসলাম জানান, সাড়ে ছয়শর বেশি যাত্রী নিয়ে সকালে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসে পর্যটক এক্সপ্রেস। ট্রেনটি ষোলশহর স্টেশন পেরিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর রেললাইনের ওপর পানি দেখতে পেয়ে চালক ট্রেন থামিয়ে দেন। পরে ট্রেনটিকে ব্যাক করিয়ে নিরাপদ রাখতে ষোলশহর স্টেশনে এনে রাখা হয়েছে। পানি নেমে গেলে ট্রেনটি আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা করবে।

রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ধসে ১ নারীর মৃত্যু ও আহত ২ : রাঙ্গুনিয়ায় টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে পাহাড়ধসে রেনু আক্তার (৫৬) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুজন। ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের অংশ ধসে একটি বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে থাকা রেনু আক্তার ঘটনাস্থলেই মারা যান। একই ঘটনায় আহত দুজনকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত