গাজার শাসনভার ছাড়ছে হামাস

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৬ এএম

প্রায় দুই দশক ধরে গাজা উপত্যকা শাসন করে আসছিল ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্রগোষ্ঠী হামাস। ২০০৬ সালের নির্বাচনে জয়ের পর ২০০৭ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ফাতাহর কাছ থেকে এক লড়াইয়ের মাধ্যমে গাজার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছিল হামাসের প্রতিরোধ যোদ্ধারা। দীর্ঘ এই সময়কাল পর গত সোমবার অঞ্চলটি শাসন ভার ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে গোষ্ঠীটি; উপত্যকাটিতে হামাসের শাসন কাঠামোর বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অবরুদ্ধ এই অঞ্চলে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি টেকনোক্র্যাট (পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত) কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম হলো। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবির বিপরীতে একতরফাভাবে নিরস্ত্র হওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি সংগঠনটি।

হামাসের এই সিদ্ধান্তকে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে গাজায় একটি ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে হামাস বারবার বলে আসছিল তারা গাজার দৈনন্দিন শাসনভার থেকে সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে সরকারের জরুরি কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা তার পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করার এবং জরুরি কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পদক্ষেপ মূলত চলমান ব্যবস্থার প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শন, পূর্ব-সম্মত চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে সহজতর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

হামাসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত একটি পরিকল্পনার আওতায়, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন তদারকি করার জন্য গঠিত ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি) বা গাজা প্রশাসন বিষয়ক জাতীয় কমিটির দ্রুত গাজায় প্রবেশ কামনা করছেন তারা। হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, হামাস এই নতুন পদক্ষেপটি নিয়েছে, যাতে গাজা উপত্যকার দায়িত্বে তারা আর না থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো দখলদার বাহিনীর সব ধরনের অজুহাত উচ্ছেদ করা, যারা এখনো তাদের আগ্রাসন এবং (ফিলিস্তিনিদের) নির্মূলের যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছে। তবে হামাসের আরেক কর্মকর্তা মাহমুদ জোর দিয়ে বলেন, এই পদক্ষেপের অর্থ এই নয় যে, হামাস গাজায় তাদের রাজনৈতিক বা সামরিক ভূমিকা ত্যাগ করছে। বরং তারা মূলত গাজার প্রত্যক্ষ বেসামরিক সরকার পরিচালনা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে।

হামাসের এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন এনসিএজির প্রধান আলি শাআত। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন ‘আমরা নিশ্চিত করছি যে, প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সক্ষমতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এনসিএজি তার দায়িত্ব বুঝে নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হামাসের এই ঘোষণা মূলত স্থবির হয়ে পড়া শান্তি প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি প্রতীকী উদ্যোগ। এই অচলাবস্থার কারণে গাজায় পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মতে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা, যা বর্তমানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে, সেখানে সীমিত পরিসরে ত্রাণ, পুনর্গঠন ও এনসিএজির শাসনব্যবস্থা চালুর ইসরায়েল-সমর্থিত প্রস্তাবেরও জবাব এটি। চলতি বছর জানুয়ারিতে এনসিএজি গঠনের পর থেকে এর ১৩ সদস্যকে গাজায় প্রবেশ করতে দেয়নি ইসরায়েল। তারা বর্তমানে কায়রোতে অবস্থান করছেন।

গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ইসরায়েল : রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অভ্যন্তরীণ বিভেদে গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ইসরায়েল। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন নীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে জনগণের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ। সাম্প্রতিক এক  জরিপে দেখা গেছে দেশটির বেশিরভাগ নাগরিকের আশঙ্কা  গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। জিউইশ পিপল পলিসি ইনস্টিটিউটের জরিপে অংশ নেওয়া ৭৯ শতাংশ ইসরায়েলি জানান, ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সামাজিক অবস্থার ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। দেশের ভবিষ্যত নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ৪৯ শতাংশ নাগরিক। ৬০ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করে, গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে দেশ।

জরিপ অনুযায়ী, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের গৃহীত নানা সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে। এর আগে দেশটির সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রেসিডেন্ট আহরন বারাকও গৃহযুদ্ধের সতর্কতা দিয়েছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত