টেক্সাসের মাঠটিতে ফুটবল বিশ্ব চোখ রেখেছিল একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা দ্বৈরথ দেখতেÑ একদিকে কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে লিওনেল মেসির যোগ্য উত্তরসূরি ভাবা স্প্যানিশ বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। তবে মাঠের লড়াই শেষ পর্যন্ত কোনো একক নৈপুণ্যের গল্প হয়ে থাকেনি, বরং তা রূপ নিয়েছিল স্নায়ুর যুদ্ধ এবং স্পেনের দুর্দান্ত এক দলীয় সাফল্যে।
বিশ্বকাপের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে লা রোহাদের ১৮ বছর বয়সী উইঙ্গার ইয়ামালের ওপর ছিল প্রত্যাশার পাহাড়সম চাপ। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট নিয়ে বিশ্বকাপে আসা ইয়ামাল প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে বেঞ্চে থাকলেও, পর্তুগালের বিপক্ষে শুরু থেকেই মাঠে নামেন। ডানপ্রান্তে বার্সেলোনা তরুণের জন্য পর্তুগিজ ডিফেন্ডার নুনো মেন্দেস যেন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দুজনের শারীরিক ও কৌশলগত লড়াই এতটাই তীব্র ছিল যে, ম্যাচের ৫৬ মিনিটে ইয়ামালকে থামাতে গিয়ে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন মেন্দেস, তার জায়গায় নামেন নেলসন সেমেদো। স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে মনে করেন, ইয়ামালকে আটকানোর এই শারীরিক ধকলই মেন্দেসের চোটের অন্যতম কারণ।
সাধারণত গতি আর ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে চুরমার করে দেওয়া ইয়ামাল পর্তুগালের কড়া মার্কিংয়ের কারণে কাল কিছুটা রক্ষণাত্মক খেলতে ও দলের জন্য নিচে নেমে ডিফেন্ড করতে বাধ্য হন। পুরো ম্যাচে তিনি তিনটি শট নেন, যার দুটি ছিল অন-টার্গেট। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে (৪৬ মিনিটে) ডানপ্রান্ত দিয়ে বক্সে ঢুকে চমৎকার এক শটে বল জালে জড়িয়েছিলেন ইয়ামাল, তবে সামান্য ব্যবধানে তা অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায়। সদ্যসমাপ্ত মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে ২৪ গোল ও ১৭ অ্যাসিস্ট করা এই তরুণকে কাল হয়তো চেনা অতিমানবীয় ছন্দে পাওয়া যায়নি, তবে ম্যাচ শেষে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘আমার চোখে এটি লামিনের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচ ছিল। সে আজ উজ্জ্বল ছিল কি ছিল নাÑ সেটির চেয়ে বড় কথা, এই ম্যাচটি তাকে একজন ফুটবলার হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিপক্ব করবে। সে দলের জন্য লড়েছে, ডিফেন্ড করেছে। প্রতিপক্ষের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই বিশ্বকাপে আমাদের তাকে আরও প্রয়োজন।’
স্পেনের এই স্নায়ুচাপের পেছনে কাজ করছিল ২০২৫ সালের এক অতীত ইতিহাস। গত বছরের ৮ জুন উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে নির্ধারিত সময়ের খেলা ২-২ সমতায় শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৫-৩ ব্যবধানে স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল। সেই ম্যাচের পর থেকে রোনালদো সবসময়ই ইয়ামালকে গণমাধ্যমের চাপ থেকে আগলে রেখে বলেছিলেন, ‘ছেলেটাকে বড় হতে দাও, ওর ওপর বাড়তি চাপ দিয়ো না। ওর প্রতিভার কোনো কমতি নেই।’ তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই হারের ভূত তাড়িয়ে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া ছিল স্পেন।
ম্যাচ যখন পর্তুগালের সেই চেনা টাইব্রেকারের ভাগ্য কিংবা অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির হন এক অপ্রত্যাশিত নায়ক। রোনালদো বা ইয়ামাল নন, টেক্সাসের তপ্ত দুপুরে আর্লিংটনের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে স্পেনের ত্রাতা হয়ে আসেন মিকেল মেরিনো। আর্সেনালের এই মিডফিল্ডারকে দ্বিতীয়ার্ধে যখন কোচ মাঠে নামান, তখন হয়তো অনেকেই ভাবেননি তিনিই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। যোগ করা সময়ে (৯১ মিনিটে) ফেরান তোরেসের এক জাদুকরী পাস খুঁজে নেয় বক্সে অরক্ষিত থাকা মেরিনোকে। স্ট্রাইকারের সহজাত দক্ষতায় নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়িয়ে ২০১০ সালের পর স্পেনকে প্রথমবার বিশ্বকাপের শেষ আটে নিয়ে যান তিনি।
১-০ গোলের এই জয় স্পেনের যৌথ শক্তিরই জয়গান গায়। কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিতের পর সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ নিয়ে দে লা ফুয়েন্তে জানান, এই মঞ্চে প্রতিটি প্রতিপক্ষই কঠিন এবং সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। শেষ আটে স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বেলজিয়াম (যারা অন্য ম্যাচে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে)।