রবিবার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৫ এএম

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে আগামী রবিবার পর্যন্ত আট বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর মধ্যে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির প্রভাবে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের ১৫ জেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। তবে সম্ভাব্য এ বন্যা তিন দিনের বেশি স্থায়ী হবে না। ইতিমধ্যে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তিন নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে দেশজুড়ে টানা চার দিন বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে চার বিভাগের কয়েকটি নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ কয়েকটি জেলাশহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে দেশজুড়ে ভারী বৃষ্টি ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের ফলে চার বিভাগে আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাসের কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয় চট্টগ্রামের আমবাগানে ২৭৭ মিলিমিটার। এ ছাড়া বান্দরবানে ২১০ মিলিমিটার, কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ২৩০ মিলিমিটার, ময়মনসিংহে ১৭৫ মিলিমিটার, মৌলভীবাজার ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

১৫ জেলায় বন্যার শঙ্কা : বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, আগামী ৭২ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টির কারণে উত্তর-পূর্ব, পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতি প্রায় তিন দিন থাকতে পারে। এরপর, অর্থাৎ শনিবার থেকে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানের সাঙ্গু নদ, কক্সবাজারের মাতামুহুরী নদী ও হবিগঞ্জে খোয়াই নদের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া বর্তমানে দেশের সব প্রধান নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এদিকে দেশজুড়ে টানা চার দিন বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জেলা শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

কক্সবাজারে পানিবন্দি দুই লক্ষাধিক বাসিন্দা : টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি উঠেছে। বন্যায় তিন উপজেলায় প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তলিয়ে গেছে শতশত গ্রাম, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও অসংখ্য সড়ক। ব্যাহত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ, বেড়েছে পাহাড়ধসের ঝুঁকি। ইতিমধ্যে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে মাতামুহুরী উপজেলার পুরুইত্যাখালী এলাকায় মাতামুহুরী নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে বানের পানি প্রবেশ করে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পেকুয়ায় বন্যাসংশ্লিষ্ট ঘটনায় একজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। টইটং ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। পাহাড়ঘেঁষা বসবাসকারী হাজারো পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, টানা তিন দিনে জেলায় ৬৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগামী কয়েক দিনও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে। অতিভারী বর্ষণের কারণে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

নীলফামারীতে দুর্ভোগে ২০ হাজার মানুষ : নীলফামারীর কিশোরীগঞ্জ উপজেলায় একটি সেতুর সংযোগ সড়ক ধসে গেছে। এতে নদীর দুই পাড়ের অন্তত ২০ হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। গতকাল বৃহ¯পতিবার সকালে উপজেলার নিতাই ইউনিয়নের বেলতলি বাজারসংলগ্ন সেতুর এক পাশের সংযোগ সড়ক ধসে যায়।

রাঙ্গামাটির হাজারো পরিবার পানিবন্দি : জেলার কাচালং নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছে। এতে ৩০ গ্রামের হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পরিবারগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। জেলা প্রশাসন জানায়, জেলার ৪৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে চার হাজার ১৬৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে বাঘাইছড়িতে তিন হাজারের বেশি পানিবন্দি মানুষও রয়েছে। জেলায় এই পর্যন্ত ৯৭টি স্পটে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এদিকে সাজেকে ঘুরতে যাওয়া পাঁচ শতাধিক পর্যটক দ্বিতীয় দিনের মতো সাজেকে আটকা রয়েছেন। গতকাল দুপুরে মগবানে ধলমনি চাকমা নামে একজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি গত মঙ্গলবার নদী পারাপারের সময় নিখোঁজ হন। এদিকে সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বৃহস্পতিবার দুপুরে রাঙ্গামাটি পৌর এলাকার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গতদের খোঁজ খবর নেন।

সেন্টমার্টিনে খাদ্যসংকট তীব্র : বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকা এবং টানা প্রবল বর্ষণের কারণে দীর্ঘ ৯ দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর ফলে সেন্টমার্টিনে নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সেন্টমার্টিনে দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্যপণ্য মজুত রাখার মতো কোনো হিমাগার নেই। দ্বীপের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় টেকনাফ থেকে ট্রলারে করে আনা নিত্যপণ্য। কিন্তু নৌচলাচল বন্ধ থাকায় তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে।

ভোলায় জলাবদ্ধতা : উপকূলীয় জেলা ভোলার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অব্যাহত বৃষ্টিতে জেলার ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরার বিস্তীর্ণ এলাকার সড়ক, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতায় হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন নিম্নাঞ্চল-চরাঞ্চল ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরার বাসিন্দারা।

বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে ২৫ গ্রাম : টানা ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের দুটি অংশ ভেঙে গেছে। এতে কমলগঞ্জ উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। বন্যাকবলিত এলাকায় এখন বিশুদ্ধ পানির তীব্র হাহাকার দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ধলাই ও মনু নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং অন্যান্য নদ-নদীর পানিও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কালভার্ট বন্ধ করায় পানিবন্দি এলাকাবাসী : কালভার্টের পানি চলাচলের পথ বন্ধ করে বসতবাড়ি নির্মাণ করায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানিবন্দি হয়ে পড়ছেন রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের একতার বাজার এলাকার কয়েক গ্রামের মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

হাতিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত : অস্বাভাবিক জোয়ারে নোয়াখালীর উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উপকূলীয় এলাকার মানুষের জনজীবন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলি জমি। চরম দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। জোয়ারে হাতিয়ার ৭টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা ডুবে গেছে।

নির্ঘুম রাত ফেনীর লাখো মানুষের : টানা ভারী বৃষ্টি আর ভারতের ত্রিপুরা থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে ফেনীর তিন নদী-মুহুরী, কহুয়া আর সিলোনিয়ায় পানি দ্রুত বাড়ছে। ক্রমাগত বাড়তে থাকা পানির তোড়ে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় এখন নির্ঘুম রাত কাটছে পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার নদীপাড়ের লাখো মানুষের। তাদের চোখ এখন বেড়িবাঁধের দুর্বল পয়েন্টগুলোতে। ফুলগাজীর বাসিন্দা সাহাব উদ্দিন উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেন, সবচেয়ে ভয় লাগে গভীর রাত নিয়ে। কখন যে বাঁধ ভেঙে ঘরের ভেতর পানি চলে আসে, সেই আতঙ্কে চোখের পাতা এক করতে পারছি না।

খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসের শঙ্কা : টানা বৃষ্টিপাতের কারণে খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের আশঙ্কা বেড়েছে। জেলার চেংগী, ফেনী ও মাইনী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত ৪০টিরও বেশি এলাকায় পানি উঠেছে। জেলার প্রায় ৫০০ পরিবার পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত