বিনিয়োগকারীদের সংশয় দূর করুন

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৫ এএম

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মধ্যে দেশে, স্থানীয় বা বৈদেশিক, নতুন কোনো বিনিয়োগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। এর মধ্যে অধিকাংশ স্থানীয় বিনিয়োগকারীর যেহেতু দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য যেহেতু বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, সেহেতু স্টারলিংকের মতো বিশেষ সুযোগভোগী ছাড়া এ সময়ের মধ্যে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশের ছায়াও মাড়াননি। এ অবস্থায় আশা করা হচ্ছিল যে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর সার্বিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে প্রথমে স্থানীয় বিনিয়োগ সচল হতে শুরু করবে এবং পরে সেটির ওপর ভরসা করে ক্রমান্বয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগও আসতে থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে অনেক স্থানীয় উদ্যোক্তা সেভাবেই নিজেদের গোছাতে শুরু করেছিলেন এবং শোনা যায়, এ কাজে উপযুক্ত বিদেশি বিনিয়োগ-অংশীদার পাওয়া যায় কিনা, সে বিষয়ে টুকটাক খোঁজখবরও নিচ্ছিলেন বা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন।

কিন্তু উদ্যোক্তা কর্র্তৃক সেসব আশাবাদী চিন্তাভাবনা নিয়ে মাঠে নামার আগেই তাদের আবারও নতুন করে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের ধর্মান্ধ-উগ্রবাদী আচরণ নির্বাচিত সরকারের আমলে এসেও সক্রিয় থাকার বিষয়টি। উল্লিখিত ধর্মান্ধ উগ্রবাদী আচরণ সক্রিয় থাকার সর্বশেষ উদাহরণ অতি সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে আরবি লেখা সংবলিত সাদা পতাকা উত্তোলন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ বলেছে, এ বিষয়ে তারা কিছুই জানে না। এর আগে গত ৩০ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একদল উগ্রপন্থী ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী আয়োজনে বাধা দেয় এবং স্থানীয় প্রশাসন অনেকটা তাদের পক্ষেই অবস্থান নেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও নানা নির্দোষ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করেছে, মণ্ডপ, মাজার, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি ভাঙচুর করেছে। ১৪ মে ঢাকার মিরপুরের শাহ আলী মাজারে এবং ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার ‘পীরের দরগা’য় আক্রমণ করে।

সাম্প্রদায়িক শক্তি এখনো সক্রিয় ও তৎপর আছে, যেমন আছে  তাদের সমগোত্রীয় উগ্রবাদীরা তৎপর আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে। এদের কারণেই ওই সব দেশে বিনিয়োগ করতে স্থানীয়রা ভয় পান এবং বিদেশিরা প্রায় আসেনই না। আর এমনি পরিস্থিতিতে ওই রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতির প্রধান নির্ভরতা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে বৈদেশিক সাহায্য এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে কোনো না কোনো বৈদেশিক শক্তি। এরূপ পরিস্থিতি অনেকটা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশেও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকারের বোঝা দরকার, বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা তো এটিকে ২০২৪-২৫ সময়ের বাংলাদেশের মতোই ভাববেন এবং এখানে বিনিয়োগ করতে আসবেন না। আর স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় হয়েও নতুন বিনিয়োগ নিয়ে এগোতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগবেন।

এ সরকারের জন্য এই মুহূর্তের সর্বাগ্র দায়িত্ব হচ্ছে, পূর্ববর্তী সরকার যা যা করে সমাজ ও অর্থনীতিকে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল, সেসব থেকে অবিলম্বে এ রাষ্ট্রকে মুক্ত করা, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ধর্মীয় উগ্রবাদিতা প্রতিরোধ করা। প্রায় সব সূচকেই দেশের অর্থনীতি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মে মাসে রপ্তানি কমেছে ৭ শতাংশ। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির হার নামতে নামতে, ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির গতিও অত্যন্ত মন্থর, যা বস্তুত উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ না বাড়াকেই নির্দেশ করছে। উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ না বাড়ায় বাড়ছে না কর্মসংস্থানও।

অন্যদিকে দেশের তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে এবং খরাপ্রবণতা যেভাবে ক্রমে প্রবল হয়ে উঠছে (বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ আশঙ্কা করছেন এল নিনোর), তাতে আসন্ন মৌসুমে দেশে কৃষি উৎপাদন যদি ব্যাপক হারে হ্রাস পায়, তাহলে তাতে মোটেও আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু থাকবে না। এর সমাধান হচ্ছে উৎপাদন খাতে (শিল্প ও

কৃষি উভয় ক্ষেত্রে) বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। তবে এ বিনিয়োগ শুধু ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করেই বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এরূপ রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা থেকে মুক্ত রাখা।

জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে এ ধরনের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডকে কেন প্রশ্রয় দিতে হবে? রুমিন ফারহানা এমপি বর্তমান সরকারকে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্প্রসারণ বলে অভিহিত করেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে রহস্যজনক পতাকা উত্তোলন কিংবা শাহ আলী মাজারের ঘটনায় যে সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের কর্মীরাই যুক্ত থাকুন না কেন, তাদের অবিলম্বে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একইভাবে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে কুষ্টিয়ার পীরের দরগায় আক্রমণকারীসহ অন্যান্য উগ্রবাদী হিংসাত্মক ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব অপরাধীকেও। কিন্তু বাস্তবে এ কাজগুলো সেভাবে এগোচ্ছে না। তাহলে কি রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবটি অ-দেওয়াই থেকে যাবে?

দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য তো বটেই, সে সঙ্গে দেশে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যেও সরকারকে সব প্রকার উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করতে হবে। যে ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশ-বিদেশের নানা স্তরের মানুষের নিন্দার পাত্র হয়ে উঠেছিল, সেই একই কর্মকাণ্ডের বোঝা একটি নির্বাচিত সরকার কেন করবে? বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকার এ দেশকে সংবিধানের নির্দেশনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হবে, সেটিই প্রত্যাশা। বিনিয়োগের পথ মসৃণ করা দরকার দেশ-জাতি ও অর্থনীতির স্বার্থেই। এর জন্য সরকারকে বিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে যে কাজগুলো করা জরুরি এ নিয়ে কথা হয়েছে বিস্তর। এখন সরকারের করণীয় কাজগুলো করতে হবে রাজনৈতিক সমীকরণ-মেরুকরণের ঊর্ধ্বে ওঠে। 

লেখক  : সাবেক পরিচালক, বিসিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত