একটি চুক্তি, অনেক প্রশ্ন ও বাধ্যবাধকতা

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৬ এএম

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি যেন একটা হুকুমনামা। বাংলাদেশই সম্ভবত একমাত্র দেশ, যার সরকারি কিছু লোক নিজ আগ্রহ, উদ্যোগ ও গরজে দেশের জন্য এমন একটা ভয়াবহ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিসংশ্লিষ্টদের চেহারা-ছবি দেখলে মনে হবে বাংলাদেশি। কিন্তু বাস্তবে তারা যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের হয়ে কাজ করেছে। আমরা জানি চুক্তিটি নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে চলতি বছর ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষর হয়েছে। কিন্তু তার আগের জুন মাসের বাজেটেই এর বাস্তবায়ন শুরু হতে দেখা গেছে। 

এই বাণিজ্যচুক্তির আংশিক বিবরণ যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রকাশ করেছে, বাংলাদেশ সরকারের তরফে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু প্রকাশিত হয়নি, সংসদেও এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। চুক্তির খসড়ায় বাংলাদেশের ওপর আরোপিত বাধ্যবাধকতার কথা স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। আর বাংলাদেশ সেগুলোতে কোনো ব্যত্যয় ঘটালে যুক্তরাষ্ট্র কী কী ব্যবস্থা নেবে তা বলা হয়েছে। সেজন্যই বলছি, এটা একটা হুকুমনামা। আমাদের প্রয়োজন না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বৃদ্ধির এই চাপ দেওয়ার বিষয়ে যুক্তি, সেখানে আমরা রপ্তানি বেশি করি আর আমদানি করি কম। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য এমন শর্ত। এ কথা তো তাহলে উল্টো ভারত ও চীনের ক্ষেত্রে আমাদের বলতে হবে। ভারত ও চীন থেকে আমরা যত আমদানি করি তার তুলনায় রপ্তানি করি অনেক কম। তাদের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক। সেটা মেটাতে গিয়ে আমরা কি যুক্তরাষ্ট্রের মতো তাদের বলব, প্রয়োজন না থাকলেও আমাদের দেশ থেকে তোমাদের অবশ্যই বেশি আমদানি করতে হবে? এগুলো হাস্যকর এবং অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক।

বিশ্বে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি হতেই পারে। বাণিজ্যিক লেনদেনের মাধ্যমে বৈশি^ক অর্থনীতিতে গতি আসবে এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাজার অর্থনীতির কিছু নিয়ম আছে। আমরা আমাদের জন্য দরকারি পণ্য আমদানি করি আর উৎপাদনের পর উদ্বৃত্ত পণ্য রপ্তানি করি। আমদানি সেখান থেকেই করি যেখানে কম মূল্যে মানসম্পন্ন পণ্য পাওয়া যায়। ফলে একেক দেশের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক লেনদেন হয় ভিন্ন ভিন্ন। বাজার অর্থনীতির নিয়ম তদারকির জন্য আছে বিশ^ বাণিজ্য সংস্থা নামে একটি প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে এসব বিধিব্যবস্থার কিছুই অনুসরণ করা হয়নি বরং চুক্তির ধারার মধ্যে জোরজবরদস্তি ও বাধ্যবাধকতাই প্রধান করে রাখা আছে। দরকার না থাকলেও তাদের পণ্য বেশি বেশি আমদানি করতে হবে শুল্ক বাদ দিয়ে আর আমাদের পণ্য রপ্তানি করতে হবে অনেক বেশি শুল্ক দিয়ে।

সরকার এবার বিশাল বাজেট পাস করেছে। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বলে বাজেটকে অভিহিত করা হয়েছে। বাজেটের প্রভাব জনজীবনে কতটা পড়বে তা বাজেট বাস্তবায়নের উদ্যোগেই বোঝা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, নানা খাতে আমাদের ভর্তুকি বাড়বে। কারণ চুক্তির বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক বেশি দামে অনেক অপ্রয়োজনীয় আমদানি করতে বা বাড়াতে হবে। এসব পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে। বোয়িং বিমান, অস্ত্রশস্ত্র, মাছ মাংস, গম সবই। বেশি দামে আমদানি করলে ওই পণ্য বাজারে বিক্রির দায়িত্ব তো সরকারকেই নিতে হবে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিতে হবে। শুল্ক মওকুফ করার কারণে বাংলাদেশ রাজস্ব আয় হারাবে আর অন্যদিকে ভর্তুকি ব্যয় বাড়বে। এই অর্থ কোথা থেকে আসবে? এর দায় চাপবে বাংলাদেশের জনগণের ওপর। উপরন্তু আমাদের বিকাশমান ওষুধ ও পোলট্রি শিল্পে বাড়তি চাপ পড়বে। স্থানীয় এ শিল্পের বিকাশের গতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থানের ঝুঁকিতে পড়বেন। শর্ত দেওয়া হয়েছে ই-কমার্স ও আইটি খাতেও। এ খাতে অনেক তরুণ সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই কাজ করছেন। এই চুক্তির আরও ভয়াবহ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় অসুবিধাজনক কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ বাণিজ্য বা অন্য কোনো চুক্তি করতে পারবে না।

খনিজ সম্পদের ওপর মার্কিন কোম্পানির কর্তৃত্ব বাড়ানোর বিষয়েও চুক্তিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ৯০ দশকের প্রথম থেকেই বড় বড় মার্কিন কোম্পানি এই খাতে যুক্ত ছিল। দেশীয় কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি কিন্তু তাদের অধীনে হয়েছে। এ দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ এখনো মিলেনি। তাদের অবহেলায়/অদক্ষতায় দেশের ২৫০-৩০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফলে দেশীয় খনিজ সম্পদ রপ্তানির চাপ বাড়বে। স্মরণে আছে, এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এমন যুক্তিও এসেছিল, মার্কিন কোম্পানি ইউনোকালের মাধ্যমে ভারতে গ্যাস রপ্তানি না করলে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ধস নামবে। প্রচার করা হচ্ছিল এ শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে ও লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। মনে রাখা দরকার বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক তারা যে আমদানি করে তা দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়। এখানে অল্প মূল্যে পোশাক কিনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আরও অনেক বেশি মুনাফায় বিক্রি করে। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত না মানলে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের বাণিজ্য ধসে যাবে এমনটি ভাবার কারণ নেই। এক্ষেত্রে অনেক সময় জুজুর ভয় হিসেবে অনেক কিছু হাজির করা হয়। 

দেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কার্যক্রম তদারকি করলে একটা জিনিস স্পষ্ট হবে। গত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস অবসর নেওয়ার পর ওই দেশের তেল কোম্পানির লবিস্টের দায়িত্ব নিয়ে তাদের সঙ্গে সরকার যাতে তেলগ্যাস চুক্তি করে তার জন্য দেনদরবার শুরু করেন। লবিস্টের ভূমিকায় তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গেও তখন দেখাসাক্ষাৎ করেছেন। সে অনুযায়ী উৎপাদন বণ্টন চুক্তি সংশোধনও হচ্ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ড. ইউনূসের সঙ্গেও ধরাধরি করেছেন। সেই চুক্তির কাজ এখনো অগ্রসর হচ্ছে। বিশে^র দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্র কেন এমন জোরজবরদস্তি উচ্চ শুল্ক চাপাচ্ছে? তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটই এমন যে, সেখানে উন্মাদনা ছাড়া আর পথ নেই। দেশটি এতটাই ঋণগ্রস্ত যে, প্রতি বছর আরও ঋণ নেওয়ার জন্য কংগ্রেসের অনুমতি নিতে হয়। এখন তারা যেসব দেশ থেকে ঋণ নেয় তার মধ্যে চীন একটি। কেন এত ঋণ? কারণ যুক্তরাষ্ট্র করপোরেট খাতকে অনেক ধরনের করছাড় দেয়। সামরিক খাতে উচ্চ ব্যয় করে। এ বছর ট্রাম্প যুদ্ধ খাতে আরও বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য কংগ্রেসে আবেদন করেছেন। সে জন্য তারা বৈশি^ক বাণিজ্যে শুল্কবৃদ্ধির মাধ্যমে  বাড়তি আয় করতে চায়। গোটা বিশ্বেই শুল্ক নিয়ে জটিলতা ও বাণিজ্য নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এমন উন্মাদনা পাত্তা দেয়নি বেশিরভাগ দেশ।  অধিকাংশ দেশ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নও এতে রাজি হয়নি। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আদালতই ট্রাম্পের এসব সিদ্ধান্ত অবৈধ বলে রায় দিয়েছে।   

অথচ বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার এগুলো বিবেচনা না করে তড়িঘড়ি করে এ বাণিজ্য চুক্তি করে ফেলেছে, যেন তাদের কোনো দায় আছে বা খুশি করার ব্যাপার আছে। মানুষ ভাবে চুক্তির সময় টেবিলের একপাশে এক পক্ষ আর অন্যপাশে আরেক পক্ষ। কিন্তু অনেক সময় আলোচনায় টেবিলে দুপক্ষ আসলে একই পক্ষের হতে পারে। বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যারা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তারা আসলে মার্কিন পক্ষেরই লোক। এখন ক্ষমতায় নির্বাচিত সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পক্ষ যে ভূমিকা গ্রহণ করেছে তা খুবই বিপজ্জনক। সংসদে এ চুক্তির ব্যাপারে সব দলই বিস্ময়করভাবে চুপ। এজন্যই দেশের মানুষের এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার গুরুত্ব খুবই বেশি। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সংগঠনের ভূমিকাও জরুরি। এ চুক্তি পূর্ণ কার্যকর হলে তারাই সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা বলেছিলাম যে, এসব চুক্তির সঙ্গে যারা যারা জড়িত তাদের নিয়ে তদন্ত করতে হবে, বিচার করতে হবে এবং তদন্তের স্বার্থে তারা যেন দেশত্যাগ করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু তা না করে নির্বাচিত সরকার এ রকম একজন ব্যক্তিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছে। নির্বাচিত সরকারের দায়দায়িত্ব অনেক বেশি, জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি আরও বেশি করতে হবে। তাই তাদের অন্যতম দায়িত্ব হবে এই চুক্তিগুলোর শে^তপত্র প্রকাশ করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করা এবং তাদের জবাবদিহি ও বিচারের আওতায় আনা।

গণতন্ত্র বলতে শুধু নির্বাচনকে বোঝায় না। জনগণের জীবন ও নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের কর্র্তৃত্ব কতটা আছে, সেটির ওপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জোর। জনগণকে উপেক্ষা করে একের পর এক দেশের জন্য ক্ষতিকর চুক্তি হতে থাকলে তা গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিই দেখায়। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ তারেক রহমানের এই সেøাগান খুব ভালো। তা যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রথম কাজ হলো, এই চুক্তিগুলো থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করা। সেই পথ আছে, বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই তা দেখানো শুরু করেছে। দরকার শুধু মেরুদ- এবং স্বাধীন দেশের আত্মসম্মানবোধ।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্র ও সমাজ চিন্তক। সাবেক সদস্য সচিব, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। 

  [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত