অর্থ বিভাগ থেকে জারি করা এক পরিপত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সরকারি টাকায় বিদেশ সফর বন্ধ এবং গাড়ি কেনায় আরোপ করা হয়েছে কড়াকড়ি। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে আরও কিছু নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সরকারিভাবে ব্যয় সংকোচনের এই নীতি সাধুবাদযোগ্য বটে, তবে এর যথাযথ প্রতিপালনের ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের নির্মোহ অবস্থান নিতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, ২০০৭-০৮ সালে ভয়াবহ বৈশি^ক অর্থনৈতিক সংকট বা মন্দা দেখা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছিল আমাদের দেশেও। তখন সরকারিভাবে ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে তৎকালীন সরকার কিছু সিদ্ধান্ত নিলেও এর কাক্সিক্ষত রূপ দৃশ্যমান হয়নি।
৯ জুলাই দেশ রূপান্তরে বলা হয়েছে, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে সরকারি দপ্তরগুলোয় আর্থিক ব্যয় কমানোর জন্য চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেটের আওতায় সব ধরনের মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ এবং সুদমুক্ত বিশেষ ঋণসুবিধায় গাড়ি কেনাও স্থগিত করা হয়েছে। সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে সরকার এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ, পাবলিক সেক্টর-করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো কোনো কর্মকর্তার নানা অজুহাতে সরকারি খরচে ‘ভ্রমণ বিলাস’ উৎকটরূপে দৃশ্যমান হয়ে প্রশ্ন তুলেছে ফিরে ফিরে।
আমরা মনে করি, সরকারি ব্যয়ের সাশ্রয় ও মিতব্যয়িতা একটি দেশের অর্থনীতি ও সুশাসনের মূল ভিত্তি। প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ চাণক্য বলেছিলেন, ‘যে রাজা বা সরকার নিজের কোষাগার বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি সুরক্ষিত রাখতে জানে না, কর্মকর্তাদের বিলাসী আচরণ ও অপচয় ঠেকাতে পারে না সে নিজের লোকসান ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন তার শাসনামলে বলেছিলেন, ‘মিতব্যয়িতা কেবল ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, জাতীয় পর্যায়েও সম্পদের একটি বিশাল উৎস।’ এর প্রতিফলন তার শাসনামল তো বটেই, ব্যক্তি জীবনেও ঘটিয়ে নজির স্থাপন করে গেছেন। সরকারি অর্থায়নে হাস্যকর বিষয়েও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণের ফলে কত অপচয় হয়েছে এর হিসাব মেলানো ভার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন পরিপত্রে সেই পথ রুদ্ধের কথা বলা হয়েছে।
‘ভ্যালু ফর মানি’ বলে ত্রিশব্দের এই বাক্যবন্ধটির মর্মার্থ ব্যাপক। এর অন্তর্নিহিত অন্যতম মূল বিষয় হলো, কোনো পণ্য বা সেবার দামের তুলনায় তার গুণগত মান, উপযোগিতা এবং কার্যকারিতার সর্বোত্তম ভারসাম্য অর্থাৎ খরচ করা প্রতিটি টাকার সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন। অর্থ বিভাগের পরিপত্রে সবক্ষেত্রে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার বা ওই ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘ভ্যালু ফর মানি’র বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে এক পরিপত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের সব প্রকার বৈদেশিক ভ্রমণ স্থগিত করা হয়। ওই পরিপত্রে বলা হয়েছিল, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বিদ্যমান বৈশি^ক সংকটের প্রেক্ষাপটে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব প্রকার এক্সপোজার ভিজিট, এপিএ ও ইনোভেশনের আওতাভুক্ত ভ্রমণ এবং কর্মশালা ও সেমিনারে অংশগ্রহণসহ সব প্রকাশ বৈদেশিক ভ্রমণ বন্ধ থাকবে। কিন্তু সর্বাংশে তা প্রতিপালিত না হওয়ার অনভিপ্রেত নজির আছে। আমরা এর পুনরাবৃত্তি প্রত্যাশা করি না।
প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। আমরা আশা করি, অর্থ বিভাগের পরিপত্রটি ‘কাগুজে দলিল’ হয়ে থাকবে না। সরকারের ব্যয় সাশ্রয় ও মিতব্যয়িতার মূল লক্ষ্য হলো জনগণের করের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা, এটা যেন দায়িত্বশীলরা বিস্মৃত না হন। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনমানে মূল্যস্ফীতির অভিঘাতের বিষয়টিও আমলে রাখতে হবে।