শিক্ষায় ঠনঠন, বরাদ্দ দেড় কোটি

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম

কোনো নিয়মিত পাঠদান বা কার্যক্রমের অস্তিত্ব না থাকলেও দেড় কোটি টাকার বিশাল সরকারি বরাদ্দ পেয়ে আলোচনায় এসেছে মাগুরার শালিখার ‘মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজ’। নামফলকহীন এই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি আধাপাকা ভবনই জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত প্রায়। দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই এটি আদৌ কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিনা। বেশিরভাগ কক্ষই তালাবদ্ধ, তবে জানালা দিয়ে ভেতরে তাকালে ধুলোমাখা কিছু বেঞ্চ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম সচল না থাকলেও এমন মোটা অঙ্কের বরাদ্দের খবর স্থানীয়দের মাঝে তীব্র চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো উন্নয়নে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজের অবস্থান উপজেলার আড়পাড়া-কালিগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে চুকিনগর এলাকায়।

সরেজমিনে চুকিনগর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজের কোনো নামফলক নেই। কলেজের নামে থাকা পুরনো দুটি ভবন অনেকটাই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। চারপাশ ঝোপঝাড় ও ময়লায় আচ্ছন্ন। সামনে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পুরো প্রতিষ্ঠানে কোনো লোকজনের উপস্থিতি নেই। দুটি ভবনের কিছু কক্ষের দরজা তালাবদ্ধ, সেগুলোতে মরিচা পড়েছে। আর কিছু কক্ষ খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। কিছু কক্ষের বেড়া ভেঙে জরাজীর্ণ অবস্থা, যে কেউ বিনা বাধায় ভেতরে ঢুকতে বা বেরোতে পারে। স্থানীয় দুজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৫ সালে যাত্রা শুরুর পর প্রথম কয়েক বছর শিক্ষার্থীদের আনাগোনা থাকলেও গত প্রায় সাত বছর এখানে নিয়মিত কোনো শিক্ষা কার্যক্রম তাদের চোখে পড়েনি। বর্তমানে শিক্ষার ঠনঠনে অবস্থা। এর মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চুকিনগর গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘এই কলেজের যারা উদ্যোক্তা তারা বিএনপির রাজনীতি করতেন। সে কারণে কলেজ চালুর কয়েক বছরের মাথায় আর চালাতে পারেননি’।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ তিনি ছিলেন আড়পাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। তার সন্তানদের উদ্যোগে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। তার বড় ছেলে মনিরুজ্জামান চকলেট উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে জেলা বিএনপির সদস্য। কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে আছেন মুন্সী শহিদুর রহমানের আরেক ছেলে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান নবাব। তিনি অবশ্য দাবি করেছেন কলেজটি সম্পূর্ণ চালু রয়েছে। মোহাম্মদ কামরুজ্জামান নবাব জানান, কলেজটি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাঠদানের অনুমতি ও অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি পেয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি রয়েছে (প্রথমে অবশ্য ২৫-৩০ জনের কথা বলেন)। এরমধ্যে চলতি বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১৫ জনের মতো।

গত ৭ জুলাই মঙ্গলবার দুপুরে তিনি বলেন, ‘এখন পরীক্ষা চলমান থাকায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এখানে যারা শিক্ষার্থী তারা বেশিরভাগই চাকরিজীবী এ কারণে নিয়মিত আসে না। তবে আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছরই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়। গত মাসেও ক্লাস হয়েছে ওখানে’। অধ্যক্ষ জানান, তিনিসহ প্রতিষ্ঠানে ১৪ জন শিক্ষক কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত না হওয়ায় সব শিক্ষকই খ-কালীন হিসেবে চাকরি করছেন।

ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থার বিষয়ে অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান নবাব বলেন, ‘গত ১৭ বছর ধরে ৮-১০টি মামলার শিকার হয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি। এখানে যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে তাদের নামেও মামলা দেওয়া হয়েছে। একবার ঝড়ে টিনের চালা উড়ে গিয়েছিল। সাহায্যের জন্য ইউএনও অফিসে গেলে কাগজ ছুড়ে ফেলে দিত। নতুন ভবন হলে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াবে।’

এদিকে মাগুরা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিচালন বাজেটের আওতায় জেলার দুটি সংসদীয় আসনে তিনটি করে মোট ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে ভবন নির্মাণে দেড় কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শালিখা উপজেলার মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজ এর মধ্যে একটি। এই চিঠিতে দরপত্র আহ্বানের লক্ষ্যে নির্বাহী প্রকৌশলীকে আগামী ১৫ জুলাই তারিখের মধ্যে সরেজমিন জরিপ প্রতিবেদন ও ১৫ আগস্টের মধ্যে মাটি পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাগুরা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সরকার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সরেজমিনে সার্ভে (জরিপ) করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। ওই সার্ভে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রধান কার্যালয় সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের টেন্ডার কার্যক্রমে যাওয়া হবে কিনা।’

তিনি আরও জানান, বর্তমান জরিপ ফরমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কিত কোনো নির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া হয়নি। তবে একটি মন্তব্য কলাম রয়েছে। জরিপ চলাকালে কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যত্যয় বা অন্য কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়লে তা ওই মন্তব্য কলামে উল্লেখ করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে।

পদাধিকার বলে মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চাইলে শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন,‘সম্প্রতি ওই প্রতিষ্ঠানে সরকারি বরাদ্দে মাটি ফেলার কাজ তদারকি করতে গিয়েছিলাম। তবে কলেজের ভেতরে প্রবেশ করা হয়নি। তাই অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়নি। তবে শুনেছি প্রতিষ্ঠানটি চালু আছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত