একজন ভালোবাসার ফেরিওয়ালা  

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

রবিবার সকাল সাড়ে ৭টা। টিভিতে আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ডের খেলা চলছিল। আর বাইরে প্রবল বর্ষণ। এ সময়ই আসে সেই দুঃসংবাদ। সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। কিছুক্ষন টিভি বন্ধ করে আপনার বর্ণাঢ্য জীবনের কথাই ভাবছিলাম। কত স্মৃতি এই বিশাল ব্যক্তিত্বের মানুষটার সাথে। বিশেষত ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত লম্বা সময় স্পিকারের দায়িত্বে থাকাকালে কতই না সুযোগ হয়েছে তার কাছে যাবার। 

২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর অনেকই তাঁকে মন্ত্রী না বানানোতে ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু মন্ত্রিসভা গঠনের কয়েকদিন পরই জানা যায় ওই সময়ের সংসদনেতা বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে স্পিকার হিসেবে চান। ফলে বিএনপি সরকার গঠনের কয়েক দিন পরই তিনি সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর বিদায়ী স্পিকার আবদুল হামিদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্পিকারের দায়িত্ব বুঝে নেন। তখন আমি প্রথম আলোর রিপোর্টার হিসাবে সংসদে কাজ করি। 

সংসদ ভবনের ৫ম তলায় স্পিকারের কক্ষে বিদায়ী স্পিকারের কাছ নতুন স্পিকারের দায়িত্ব নেয়ার ঘটনা দেখার সুযোগ হয়েছিল। এরপর টানা ৯ বছর তার স্পিকারের দায়িত্ব পালন কালে সংসদে তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। রিপোর্টিং এর কাজের বাইরে বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে সাংবাদিকদের নানা পেশাগত ইস্যুতে তার সহায়তা সমর্থন পেয়েছি। 

সাংবাদিকদের পেশাগত অসংখ্য ট্রেনিং এর আয়োজন ওই সময় করা সম্ভব হয়েছিল। এসব অনেক আয়োজনেই তিনি নিজে উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের উৎসাহ দিতেন। বলতেন সাংবাদিকদের পড়াশুনা করতে হবে সারা জীবন। সংসদে ওই সময় থেকেই আমরা সংসদ লাইব্রেরিতে কাজ করার অবারিত সুযোগ পাই। সংসদ লাইব্রেরির অফুরন্ত বইয়ের ভাণ্ডার ছিলো আমাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ওই সময় সংসদ লাইব্রেরির প্রধান আবু দাউদ ভাইও আমাদের উৎসাহ দিতেন। 

শুধু বাংলাদেশের সংসদ নয়, পৃথিবীর নানা দেশের সংসদ কার্যপ্রণালী দেখার সুযোগ হয়েছে। পেশাগত সম্পর্ক ছাড়িয়ে তার সাথে সাংবাদিকদের সাথে চলে গিয়েছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ে। তার একটা কথা আজ খুব মনে পড়ছে- ঘৃণা ছড়িয়ে নয় ভালোবাসা ছড়িয়েই কেবল দেশের জন্য কাজ করা যায়। মানুষকে ভালোবাসার এক দারুণ শক্তি ছিলো তার। আর তাইতো রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে বঙ্গভবনে গিয়েও সংসদের কর্মরত সাংবাদিকদের ভুলেননি। ডেকেছেন বঙ্গভবনেও। বঙ্গভবনের সাময়িক দায়িত্ব আবারও ফিরে আসেন সংসদেই। 

সংসদ না থাকলেও ওয়ান ইলেভেনের পুরো সময়টা তিনি শক্ত করে সংসদের হাল ধরে রেখেছিলেন। সেনা সমর্থিত তত্তাবধায়ক সরকার ওই সময় এমপি হোস্টেল তাদের কাজে নেয়ার চেষ্টা করলেও স্পিকার শক্ত হাতে তা আটকে দেন।                                                  ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। নিয়ম অনুসারে ওই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। নির্বাচিত হন সংসদের নতুন স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। নতুন স্পিকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে বিদায় নেন তিনি। 

বিদায় নেবার আগে দুই স্পিকার অনেকক্ষণ একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। ভালোবাসায় আপ্লুত হবার ওই ছবি পরদিন অনেক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ওইদিন স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার বলেছিলেন, দেশের সব সমস্যার সমাধান করতে হবে নির্বাচনের মাধ্যমে। বলেছিলেন নির্বাচিত সংসদ হলো মানুষের ভালোবাসার জায়গা। সংসদে সব বিতর্ক হবে মানুষের কল্যাণে। বিদ্বেষ আর ঘৃণা নয় সংসদ ছড়াবে ভালোবাসার সুবাতাস। কিন্তু সেই কথা আমরা রাখতে পারিনি। বড় ভালবাসাহীন এক সময় পার করছি আমরা। এই সময়ে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের মত মানুষের বড় প্রয়োজন ছিলো।   
       
আজ তার শেষ বিদায়ের দিন ভর বর্ষা উপেক্ষা করেও মানুষের ঢল নামে তাঁকে এক নজর দেখতে। ধানমন্ডি কিংবা সংসদ ভবনের জানাজায় ছিলো তার অসংখ্য স্বজনের ভীড়। বিকেলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে শেষবিদায় নেন মানুষের ভালবাসায়। যে ভালোবাসার সুগন্ধ তিনি ছড়াতে চেয়েছেন সারাটা জীবন।   

আশিস সৈকত: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত