হরমুজ প্রণালী নিয়ে চরম উত্তেজনার মধ্যে গত কয়েক দিনে ইরানে সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মাত্রা ব্যাপক বাড়িয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। গত মাসে দুই পক্ষের মধ্যে একটি অস্পষ্ট সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর এটিই সবচেয়ে তীব্র বোমাবর্ষণের ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে ইরানে নতুন করে পুরোদস্তুর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ থেকে ইরানের শত শত সামরিক এবং বেশ কিছু বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দেশের অন্তত ১০টি প্রদেশে এসব হামলা হয়েছে, যার বেশিরভাগই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর কাছে দক্ষিণ ইরানে অবস্থিত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরুর পর চার মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। রাজধানী তেহরানে এখনো সরাসরি হামলা না হওয়ায় সেখানকার কোটি মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক রয়েছে। তবে দেশটির অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
গতকাল রবিবার (১২ জুলাই) তেহরানের পূর্ব অঞ্চলের ২১ বছর বয়সী বাসিন্দা ফারশাদ বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন এতটাই বিশৃঙ্খল যে সামনে কী ঘটবে তা অনুমান করা কঠিন, তবে লক্ষণ ভালো ঠেকছে না। আমি শুধু আশা করি যেন নতুন করে পুরোদস্তুর যুদ্ধ শুরু না হয়। অন্য সব সমস্যার পাশাপাশি প্রতিদিনের বোমাবর্ষণ সহ্য করার মতো ধৈর্য আমার আর নেই।’
এদিকে গত শনিবার (১১ জুলাই) ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দিবাগত রাতে জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে হরমুজ প্রণালীকে আবারও অবরুদ্ধ বা বন্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আইআরজিসি আরও জানায়, ওমানের কাছাকাছি পশ্চিমা-সমর্থিত দক্ষিণ রুট ব্যবহার করে যাতায়াতকারী দুটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। জাহাজ দুটি ইরানের নির্ধারিত উত্তরের রুট ব্যবহার না করে ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিল।
সামরিক উত্তেজনা কমানোর আলোচনা স্থিমিত হয়ে পড়ায় ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, কাতার ও ওমানসহ পুরো অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।
তেহরানের আরেক বাসিন্দা নাস্তারান জানান, রাতের বেলার এই হামলা আগের চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক ছিল। তিনি বলেন, ‘সকালে উঠে ফোনে খবর দেখার সময় ভাবিনি পরিস্থিতি এতটা খারাপ হবে। আমার মনে হয় শিগগিরই আরও হামলা হবে।’
গত এক সপ্তাহে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের হামলার পরিধি বাড়িয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তিন দফায় ইরানের ৩০০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, লজিস্টিকস, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌবাহিনীর সম্পদ। তবে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার বিষয়টি মার্কিন বাহিনী স্বীকার করেনি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মতো এবারও হরমোজগান প্রদেশে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস এবং হরমুজ প্রণালীর দিকে মুখ করে থাকা সেরি, কশম ও জাস্ক দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে। বন্দর, মাছ ধরার ঘাট, উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। এতে এক সেনা সদস্য নিহত এবং বেশ কয়েকজন জেলে হতাহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
বুশেহর প্রদেশেও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, যার একটি ইরানের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সীমানার মধ্যে পড়লেও কেন্দ্রের কোনো ক্ষতি হয়নি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে তিনটি এলাকায় হামলা হলেও প্রাদেশিক রাজধানী আহভাজে কোনো আঘাত লাগেনি। এছাড়া কোহগিলুয়েহ, বোয়ের-আহমদ এবং লোরেস্তান প্রদেশেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ-পূর্বের সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের চাবাহার, কোনারক এবং ইরানশাহরে হামলা হয়েছে। ইরানশাহরের বিমানবন্দরে হামলায় এক দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন। চাবাহারের এক বাসিন্দার ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, শহরের বিখ্যাত সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
গত এপ্রিল মাসে ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির মাধ্যমে পুরোদস্তুর সামরিক অভিযান স্থগিত হওয়ার পর থেকে গত এক সপ্তাহে মার্কিন বাহিনী ইরানি ভূখণ্ডের সবচেয়ে গভীরে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে একটি হামলা হয়েছে উত্তরের গোলেস্তান প্রদেশে, যেখানে গরগান-ইনচেহ বোরুন লাইনের আক তেকে খান রেলসেতু ধ্বংস করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রী ও পণ্যবাহী এই সেতুটি দ্রুত মেরামত করে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। তবে এই হামলা প্রমাণ করে যে ইরানের বাণিজ্য সংকুচিত করতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি রুখে দিয়ে চাপ বাড়াতে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এই রেল রুটটি ইরানকে তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান, রাশিয়া, চীন এবং ইউরেশীয় রেল নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের সময় এটি হরমুজ প্রণালীর বিকল্প স্থলপথ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
গত সপ্তাহে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন অনুষ্ঠান চলাকালীন শহর থেকে মাত্র ৫৫ কিলোমিটার দূরে একটি সেতুতে মার্কিন বাহিনী হামলা চালায়। এতে শেষকৃত্যের মিছিলে যোগ দিতে যাওয়া সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যাহত হয়।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধের শুরু থেকেই দেশটির বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা হয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার হামলার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এর ফলে দেশটির দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় পাওয়ার গ্রিড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান তাভানির-এর প্রধান মোহাম্মদ আল্লাহদাদ গত রোববার জানান, চলতি সপ্তাহে গরমের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হওয়ার মধ্যেই এই হামলার কারণে ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪,২০০ মেগাওয়াট কমে গেছে।
আলী খামেনির দাফন অনুষ্ঠান শেষে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে তাকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি। বিবৃতিতে তিনি এই হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোও একই ধরনের বার্তা প্রচার করছে। গত রবিবার তারা মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর খবর উদযাপন করেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এই যুদ্ধবাজ রাজনীতিকের মৃত্যুকে ‘জাহান্নামে পাঠানো’ বলে অভিহিত করেছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল গত ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি কার্যত ভেস্তে দিয়েছে। তারা দক্ষিণ লেবাননের আরও ভেতরে প্রবেশ করেছে এবং ইরানে পুনরায় সামরিক হামলা শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
শনিবার রাতে ইসরায়েলি একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ- যিনি মোজতবা খামেনিকে হত্যার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘দক্ষিণ লেবাননও গাজা হয়ে যাবে’ এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সেখানেও রাফাহর মতো করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।
সূত্র: আল-জাজিরা