বইচিত্র

মঙ্গলকাব্যে নিজস্ব আধুনিকতার সূচনা

মঙ্গলকাব্যে লোকসংস্কৃতি
শামীমা সুলতানা
প্রকাশক : বাংলা একাডেমি
প্রথম প্রকাশ : মার্চ ২০২৬
প্রচ্ছদ : রফিকুন নবী
মূল্য : ৫০০ টাকা

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম

বাংলা সাহিত্যের সময়কাল নির্ধারণে মধ্যযুগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে মঙ্গলকাব্য। প্রাচীন যুগের প্রামাণ্য গ্রন্থ চর্যাপদ এবং মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের বাইরে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন মঙ্গলকাব্য। নামের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। মধ্যযুগের সাহিত্যের এই বিশেষ ধারাটির মধ্য দিয়েই আমরা দেব-দেবী বন্দনা থেকে ক্রমে মানববন্দনার আভাস দেখতে পাই। যার মধ্য দিয়েই আধুনিকতার দিকে আমাদের যাত্রারম্ভ। দেখতে পাই আমাদের নিজস্বতার সূচনা। মঙ্গলকাব্য ধারার কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর যখন বলেন, ‘নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়?’ বা ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। অথবা কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী যখন চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ভাঁড়ু দত্তের মতো খল চরিত্র আঁকেন, যার তুলনা সমালোচকরা খুঁজে পান জগদ্বিখ্যাত নাট্যকার শেক্সপিয়রের ওথেলো নাটকের ইয়াগো চরিত্রের মাঝে।

আবার দেবী মনসার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে চাঁদ সওদাগরের যে প্রতিবাদ, নির্বংশ হওয়ার পরও স্বেচ্ছায় পূজা দিতে অনীহা, সাহিত্যে এমন চরিত্রের উপস্থাপন-উত্তরকালেও শিল্পোত্তীর্ণ হিসেবে স্বীকৃত। এই সব দেব-দেবীকে কেন্দ্র করে রক্তমাংসের যে মানুষ, তাদের তৎকালীন সমাজই মঙ্গলকাব্যের মূল উপজীব্য। একইভাবে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কালকেতু উপাখ্যান পর্বে নায়ক কালকেতু যখন শিকার থেকে সুবর্ণগোধিকা নিয়ে ফিরে আসেন, যিনি ছিলেন দেবী, পরে মানবী রূপ ধারণ করায় কালকেতুর সংসারে যে কলহের সঞ্চার, তাও তো আধুনিক জীবনেরই অনুষঙ্গ। পরিচয় জানার আগে, অপূর্ব রূপবতী দেবীকে দেখে নিজের সতীন ভেবে ফুল্লরার যে মূর্তি বা নিজেকে প্রতারিত জেনে, ভীতত্রস্ত ফুল্লরার যে উপলব্ধি, কেঁদে কেটে চোখ লাল করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসা, যাকে দেখে বিস্মিত কালকেতু বলছেন, ‘শাশুড়ি ননদী নাহি নাহি তোর সতা (সতীন)/ কার সঙ্গে দ্বন্দ্ব করি চক্ষু কৈলি রাতা।’ এও আমাদের আধুনিক জীবনপর্বেরই অংশ।

দেব-দেবীর বন্দনায়, তাদের মহত্ত্ব ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের কবিরা একদিকে যেমন প্রথম মানবিক সাহিত্য রচনা করছেন, তেমনি বাংলার লৌকিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকেও তুলে ধরেছেন। প্রতিটি মঙ্গলকাব্যে ‘বারোমাস্যা’ বর্ণনার মধ্য দিয়ে মঙ্গলকাব্যের কবিরা যেভাবে বাংলার ছয় ঋতুকে ঘিরে মানুষের বারো মাসের দুঃখ-কষ্ট-হাসি-আনন্দ-আচার-অনুষ্ঠানকে উপস্থাপন করে গেছেন তা তো বিস্মৃত হওয়ার মতো নয়। এমনকি নগর সভ্যতা গড়ে ওঠার বর্ণনা, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বর্ণনাও মঙ্গলকাব্যের কোনো কোনো কবির কাব্যে রয়েছে। যা সমাজতাত্ত্বিকদের কাছে তো বটেই, ঐতিহাসিকদের জন্যও কৌতূহলের।

শামীমা সুলতানা তার অভিসন্দর্ভে দেব-মহাত্ম্যের অন্তরালে তৎকালীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির যে রূপ উঠে এসেছে, তারই সন্ধান করেছেন। মঙ্গলকাব্যের লৌকিকতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে আমরা যে সাহিত্যে আধুনিকতার বৃহত্তর দিগন্তের দিকে এগিয়ে চলেছিলাম, সেই অন্তরালের মুখটি খুলে দিয়েছেন। সেখানে নিঃসংশয়ে বাঙালির সামাজিক ইতিহাসের উপকরণগুলো উন্মোচিত হয়েছে। চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত অভিসন্দর্ভটির অধ্যায়গুলো যথাক্রমে—বাঙালি সমাজ, লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্য; মঙ্গলকাব্যের পটভূমি ও প্রধান প্রধান কাব্যধারা; প্রধান প্রধান মঙ্গলকাব্যে লোকসংস্কৃতি : প্রবণতা বিশ্লেষণ, মঙ্গলকাব্যে লোকসংস্কৃতি : আঙ্গিকগত পর্যালোচনা। এ ছাড়া বইটিতে যুক্ত হয়েছে উপসংহার ও গ্রন্থপঞ্জি। উপসংহার অংশে গবেষক শামীম সুলতানা তার গবেষণালব্ধ উপলব্ধির শেষ কথায় বলেছেন, ‘মঙ্গলকাব্য বাঙালি জীবন-মানসেরই শিল্পপ্রতিভাস। সুদীর্ঘ কাল থেকে যেসব দেব-দেবী বাঙালির লৌকিক জীবনে পূজিত হয়ে এসেছেন তারা শুধু পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে বাঙালির জীবনে সম্পৃক্ত হননি। বাঙালির সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সঙ্গেও তারা একাকার হয়ে উঠেছেন।’ এই যে বাঙালির হয়ে ওঠা, সেই হয়ে ওঠার পথে তৎকালীন সমাজে প্রচলিত প্রথা, লোকাচার, লোকবিশ্বাস ও সংস্কার—এসবই উঠে এসেছিল মঙ্গলকাব্যে আর সে সব সন্নিবেশকে মধ্যযুগের সাহিত্যের মোড়ক থেকে উদ্ধার করে এনেছেন গবেষক। মঙ্গলকাব্যে লোকসংস্কৃতি মূলত গবেষণাগ্রন্থ, উদ্ধৃতি চিহ্নে ভারাক্রান্ত হলেও এর ভাষা ও বিষয়বস্তু উৎসুক পাঠকের জন্যও উপভোগ্য। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত