জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও থামেনি সংগ্রাম। ৮৮ বছর বয়সে যেখানে বিশ্রামে থাকার কথা, সেখানে স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে বসে সূক্ষ্ম কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন লোকনাথ ধর। কিন্তু বয়স্ক ভাতার টাকা নিতে গিয়ে দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন বাম হাতের দুটি আঙুল। এখন শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, হাতটি অচল হয়ে গেলে কীভাবে চলবে তার সংসার, কীভাবে পূরণ হবে ছোট মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন।
লোকনাথ ধর নরসিংদী শহরের বানিয়াছল এলাকার বাসিন্দা। পাঁচ মেয়ের জনক তিনি। ছেলে না থাকায় সারাজীবন পরিশ্রম করেই সংসারের দায়িত্ব সামলেছেন। স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে কারিগরের কাজ করে চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে বড় মেয়ের বাড়িতে থেকে প্রতিদিন নরসিংদী বাজারের একটি স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে কাজ করতেন তিনি।
বয়সের ভার, ঝাপসা দৃষ্টি কিংবা শারীরিক দুর্বলতা, কোনো কিছুই তাকে কাজ থেকে দূরে রাখতে পারেনি। কারণ, এখনও ছোট মেয়ের বিয়ে দেওয়া বাকি। সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি ওষুধপত্রের ব্যয়ও বহন করতে হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের বয়স্ক ভাতার ৩ হাজার ৯০০ টাকা তার কাছে ছিল বাড়তি সহায়তার একটি আশার জায়গা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বয়স্ক ভাতার টাকা তুলতে নরসিংদী পৌরসভায় যান লোকনাথ ধর। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে তিনি ভাতা বিতরণ কার্যালয়ের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আশ্রয় নেন। এ সময় বাইরে থাকা লোকজনের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করা হলে দরজার ফাঁকে চাপা পড়ে তার বাম হাতের দুটি আঙুল।
ঘটনার পর তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরে দরজা খুলে তাকে উদ্ধার করা হয়। ততক্ষণে তার দুটি আঙুল প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হাতে থাকা ভাতার কার্ড, পোশাকসহ শরীর রক্তে ভিজে যায়। পরে তাকে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) পাঠান।
সেখানে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করে আঙুল দুটি রক্ষার চেষ্টা করেন। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আঙুল দুটি পুরোপুরি সচল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সোমবার (১৩ জুলাই) লোকনাথ ধরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিছানায় শুয়ে দিন কাটছে তার। আহত হাতের ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারেন না। যে হাত দিয়ে সারাজীবন অন্যের জন্য স্বর্ণের গয়না তৈরি করেছেন, সেই হাত দিয়েই আর আগের মতো কাজ করতে পারবেন কি না, এ চিন্তাই এখন তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
তার স্ত্রী গীতা রাণী বণিক বলেন, ভাতার টাকা আনতে গিয়ে তিনি দুই আঙুল হারিয়ে এলেন। পৌরসভার একজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। এখন সারাদিন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। সংসার চালানো নিয়েই আমরা চিন্তায় আছি।
নাতি সজল বণিক বলেন, ডাক্তার আঙুল দুটি কেটে ফেলার কথা বলেছিলেন। আমাদের অনুরোধে রড বসিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে এটি কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। পরিবারের পক্ষে চিকিৎসার খরচ চালানো কঠিন।
নরসিংদী শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, ঘটনাটি জানার পর তারা লোকনাথ ধরের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন এবং প্রাথমিকভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি অনুদানের জন্য আবেদন করতে পরিবারকে বলা হয়েছে। আবেদন পেলে দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে। তাকে বয়স্ক ভাতা থেকে প্রতিবন্ধী ভাতায় স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
নরসিংদী পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মোছা. নাদিরা আখতার বলেন, মানুষের চাপাচাপির মধ্যে অসাবধানতাবশত তার আঙুল দরজায় চাপা পড়ে। মানবিক দিক বিবেচনা করে পৌরসভার পক্ষ থেকে তাকে এককালীন ৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, বয়স্ক ভাতা পৌরসভার নয়, এটি উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে দেওয়ার কথা। তবে পৌরসভায় পর্যাপ্ত জায়গা থাকায় এখানে ভাতা বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।