ইউরোপে গত জুন মাসের শেষের দিকে বয়ে যাওয়া টানা আট দিনের তীব্র তাপপ্রবাহে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (ইসিডিসি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমর্থিত (ডব্লিউএইচও) জরিপ সংস্থা ইউরোমোমো গত রবিবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, মৃতদের মধ্যে ৯ হাজারের বেশি মানুষের বয়স ৬৫ বছর বা এর বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মৃত্যুর মূল কারণ ছিল হিট স্ট্রোক এবং প্রচণ্ড গরমের কারণে সৃষ্ট হৃদযন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা।
ইউরোমোমোর প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট দেশভিত্তিক আলাদা তথ্য না থাকলেও, মৃতদের একটি বড় অংশই ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের বাসিন্দা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোপের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তাপপ্রবাহের প্রভাবে ইইউ দেশগুলোতে গত আট সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫০০ জন মানুষ মারা গেছে। ডেনমার্কের স্ট্যাটেন্স সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান চিকিৎসক এবং ইউরোমোমোর কর্মকর্তা লাসে ভেস্টারগার্ড জানান, এই বিশালসংখ্যক মৃত্যু অস্বাভাবিক এবং এটি সরাসরি তাপপ্রবাহের ফল। বছরের এই সময়ে এত অল্প দিনে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি মোটেও স্বাভাবিক ঘটনা নয়। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই এই মারাত্মক তাপপ্রবাহের জন্য দায়ী। আগামী বছরগুলোতে এ ধরনের আবহাওয়া বারবার ফিরে আসার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে মে ও জুন মাসের তীব্র তাপপ্রবাহে ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল সোমবার প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিশেষজ্ঞরা আবহাওয়ার তথ্য, জলবায়ু মডেল ও তাপপ্রবাহের সময় অতিরিক্ত মৃত্যুহার-সংক্রান্ত গবেষণা বিশ্লেষণ করে এ অনুমান নির্ধারণ করেছেন। গবেষকদের মতে, মৃত্যুর বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটেছে জুনের তাপপ্রবাহে। গত মাস ছিল ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুন। ওই সময় নরফোকের লিংউডে সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা ১৯৫৭ সালের একই মাসের ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রির রেকর্ড ভেঙে দেয়।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ২১-২৯ মে পর্যন্ত তাপজনিত কারণে প্রায় ৫৫০ জন এবং ১৮-২৮ জুনের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি তাপপ্রবাহই ‘হিট ডোম’-এর কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। স্থির উচ্চচাপের একটি বলয় গরম বাতাসকে দীর্ঘ সময় একটি অঞ্চলের ওপর আটকে রাখলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, যা এবারের সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় আরও ৩-৪ ডিগ্রি যোগ করেছে। তীব্র গরমে শিশু, বয়স্ক এবং আগে থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তবে সুস্থ মানুষেরও হিটস্ট্রোক, হৃদরোগ বা স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী জটিলতা দেখা দিতে পারে। গবেষণায় অংশ নেওয়া জলবায়ু বিজ্ঞানী অধ্যাপক ফ্রেডি অটো বলেছেন, এই ঝুঁকিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সুস্থ ও সবল মানুষও এ ধরনের তাপপ্রবাহে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হতে পারেন।