যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদে টান

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪২ এএম

উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক একাধিপত্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদে। ৪০ দিনের সংঘাত শেষে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও ওই যুদ্ধে ওয়াশিংটনের প্রধান সব সমরাস্ত্রের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, ইরান যুদ্ধের প্রথম ধাপে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কয়েক হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। তবে সম্প্রতি দুই পক্ষ আবারও সংঘাতে জড়ানোয় এই সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, নতুন সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরানের ৩ শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, অস্ত্রের এই ঘাটতি ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেন, গত পাঁচ দিন ধরে যুদ্ধ যেভাবে চলছে, সেটি অব্যাহত থাকলে অস্ত্রের মজুদ এতটাই কমে যাবে যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি হবে। সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্তত অর্ধেক ‘থাড’ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর, প্রায় অর্ধেক ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ৩০ শতাংশ ‘টমাহক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গবেষক মাইকেল ও’হ্যানলন বলেন, ‘অস্ত্রের মজুত আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কমে গেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই’। এই ঘাটতি পূরণ করা বেশ সময়সাপেক্ষ।

মার্ক কানসিয়ান জানান, বর্তমানে পেন্টাগন প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ১৫টি টমাহক এবং ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাচ্ছে। ২০২৬ সালে নতুন কোনো থাড ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সিএসআইএসের মতে, যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরতে অন্তত তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগবে। সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা এলেন ম্যাককাসকার জানান, সমরাস্ত্রের মজুদ আগের মতো করতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুই থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় বিশেষজ্ঞ জন ফেরারি বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বদলানোর জন্যও কংগ্রেস থেকে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে সাধারণ সময়ের ধীরগতির উৎপাদন প্রক্রিয়াই এখন বহাল রয়েছে। গত জুনে ট্রাম্প ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ প্রস্তাব করেছেন যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা যায়। পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভাগটি কাজ করে যাচ্ছে, যাতে সরবরাহব্যবস্থায় গতি আসে। তবে মার্ক কানসিয়ান মনে করেন, সরকারের এই পদক্ষেপ কার্যকর হলেও এর প্রভাব হবে খুবই সীমিত। বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের চাহিদা বাড়ায় অন্যান্য দেশকে নিজস্বভাবে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ কমতে পারে। গত বৃহস্পতিবার তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ইউক্রেনকে লাইসেন্স দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। জাপানের একটি প্যাট্রিয়ট কারখানা তৈরি করতে তিন বছর সময় লেগেছে। অন্যদিকে জার্মানি ২০২২ সালে কাজ শুরু করলেও এখনো কোনো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, চীন বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে ক্ষেপণাস্ত্রের এই সংকট বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের। উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করতে এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হবে। মাইকেল ও’হ্যানলন মনে করেন, চীন বা উত্তর কোরিয়াকে প্রতিহত করার সক্ষমতা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এই সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত