তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গত সপ্তাহে শেষ হয়েছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সবশেষ শীর্ষ সম্মেলন। এবারের সম্মেলন স্বাগতিক দেশ তুরস্কের জন্য নতুন এক দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। পশ্চিম এশিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়ে, জোটটির ৩৬তম সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্কের মধ্যকার ‘কূটনৈতিক ও কৌশলগত’ শীতল সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সম্মেলনে যোগ দিয়ে তুরস্কের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে ইতিবাচক ঘোষণা দিয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমটি এও জানিয়েছে, এজন্য আঙ্কারাকে রাশিয়ার ‘এস-৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ত্যাগ করতে হবে। রুশ ও তুর্কি সূত্রগুলো মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছে, এই সামরিক প্রযুক্তি তৃতীয় কোন দেশ অর্থাৎ সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে বিক্রি করার বিষয়ে গত কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছে।
একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্কের কাছে থাকা রাশিয়ার তৈরি অত্যাধুনিক ‘এস-৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কাছে বিক্রির প্রস্তাবকে ‘ইতিবাচক দৃষ্টিতে’ দেখছে রুশ সরকারও। তবে সূত্রগুলো সতর্ক করে বলেছে যে, এ সংক্রান্ত আলোচনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ২০১৯ সালে তুরস্ক কর্র্তৃক রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনা আঙ্কারার জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পঞ্চম প্রজন্মের ‘এফ-৩৫’ ফাইটার জেট প্রোগ্রাম থেকে তুরস্ককে বাদ দেয় এবং আঙ্কারার প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা ছয়টি এফ-৩৫ জেট এখনো আটকে রেখেছে, কারণ ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইনের মাধ্যমে এগুলো তুরস্কের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া অবরুদ্ধ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর ওয়াশিংটন ও আঙ্কারার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোড়া লাগতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘২০২০ ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট’ (এনডিএএ) অনুযায়ী, এফ-৩৫ ফাইটার জেট পেতে হলে আঙ্কারাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের কাছে আর এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নেই। ইতিমধ্যে তুরস্কের ‘কান’ যুদ্ধবিমানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ইঞ্জিন বিক্রিতে অনুমোদন দিয়েছে কংগ্রেস। গত দেড় বছর ধরে ওয়াশিংটন ও আঙ্কারা এই সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, একটি প্রস্তাব ছিল এস-৪০০-এর মূল যন্ত্রাংশগুলো সরিয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি নিরাপদ স্থানে রেখে সেগুলোকে অকার্যকর করে রাখা। কিন্তু পরে এই বিকল্পটি চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে পর্যাপ্ত মনে হয়নি, কারণ এটি শুধুমাত্র আঙ্কারার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার পথ সুগম করত।
গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে ক্রেমলিন নিশ্চিত করেছে যে, তারা এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৃতীয় কোনো দেশের কাছে বিক্রির বিষয়ে তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা করছে। রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এ নিয়ে আলোচনা আপাতত অব্যাহত থাকবে। একটি রুশ সূত্র জানিয়েছে, তৃতীয় দেশের কাছে এই সিস্টেম বিক্রির বিষয়ে তুরস্কের প্রস্তাবের জবাবে মস্কোর উত্তর ছিল : কেন নয়?’ তবে রায়ের সুনির্দিষ্ট কিছু বিশদ বিবরণ এখনো চূড়ান্ত করা বাকি রয়েছে এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। বেশ কয়েকটি তুর্কি সূত্র উল্লেখ করেছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যেই রাশিয়ার তৈরি ‘প্যান্টসির’ এর মতো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। তারা আরও জানায়, আবুধাবি তাদের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতে বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের অস্ত্র ক্রয়ের উৎস বহুমুখী করছে।
তবে এস-৪০০ বিক্রির এই চুক্তিটি তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সম্পাদিত হওয়ায় এর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না। গত শুক্রবার এ বিষয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য তুরস্কের একটি পরিকল্পনা ঘোষণার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়। তবে আঙ্কারার পক্ষ থেকে এই বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করা হয়নি।