দেশের বেশকিছু জেলায় কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে বন্যাসহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে করে মাঠে থাকা নানা ধরনের ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ঢাকার নিত্যপণ্যের বাজারে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈরী আবহাওয়ায় ফসলের ক্ষতির কারণে সরবরাহ বাধার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে মুষলধারে গত দুই দিনের বৃষ্টিতে ঢাকার পাইকারি বাজারগুলো জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। এতে পণ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বাড়তে শুরু করেছে দাম। বাজার ঘুরে দেখা গেছে কাঁচা মরিচ, সবজি থেকে শুরু করে ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে।
কৃষি বিভাগের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ৬ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত দুর্যোগের কারণে তৈরি হওয়া বন্যা পরিস্থিতিতে ১২ জেলার প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এসব জমির একটি বড় অংশই হলো সবজির চাষের। এ ছাড়া আমন ধানের বীজতলা, পাট, আউশ ধানসহ নানা ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জানা গেছে, বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি ঢাকাতেও গত দুই দিন ধরে টানা বৃষ্টিতে জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। নিউমার্কেট, কারওয়ান বাজারসহ বেশকিছু স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এর কারণে ঢাকার নিত্যপণ্যের বড় পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত কারওয়ান বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই সংকটের মধ্যে পড়েছে। কমেছে ঢাকার বাইরে থেকে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা, যেগুলো আসছে সেগুলোরও সময় লাগছে বেশি। এর মধ্যেও কিছু কিছু আড়তদার মজুদ থাকা সবজিসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির চেষ্টা করলেও অতিবৃষ্টির কারণে দুই দিন ধরে খুব বেশি পাইকার (খুচরা বিক্রেতা) পায়নি।
তবে পাইকারি বিক্রেতারা জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতার কারণে গত রবিবার ট্রাক থেকে পণ্য নামানোর মতো পরিস্থিতি না থাকলেও সোমবার রাতে কিছুটা অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যাবে। কারণ এর মধ্যে পানি অনেকটাই নেমে গেছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, সেগুনবাগিচা, ইস্কাটনসহ কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে বাজার ও মানভেদে ১৬০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দামে। যা বৃষ্টির আগে ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে। যা আবার বেড়েছে। কিছু সবজিতে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে। যা কষ্ট বাড়িয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের।
বাড্ডার সবজি বিক্রেতা অনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, টানা বৃষ্টির প্রভাবে কিছু সবজির দাম বেড়েছে। পাইকারি বাজারে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় পণ্য আসতে পারেনি। সরবরাহ কমে গেছে। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে তা বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
জানা গেছে, যে সবজিগুলো ক্রেতারা ৪০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে কিনতে পারতেন, তা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে। বাজারে পটোল, ঢ্যাঁড়শ ও পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে, যা আগে ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে। করলা বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৫০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে, যা গতকাল ৬০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া লম্বা বেগুনের দাম ৬০-৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গোল বেগুন আগের মতোই ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ঝিঙা, চিচিঙ্গা কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়।
সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারে গতকাল দুপুরে পণ্য কিনতে এসে বেসরকারি চাকরিজীবি শরিফুল ইসলাম জানান, পেঁপের কেজি ছিল ৪০ টাকা, সেটি এখন ৫০ টাকা দাম চাচ্ছে। পটোল, ঢ্যাঁড়শ যেগুলো ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেগুলো এখন ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে দাম চাচ্ছে। বৃষ্টির কারণে বিক্রেতারা সব কিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
কারওয়ান বাজার সবজির আড়তদার সমিতির সভাপতি ইমরান মাস্টার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৃষ্টিতে কারওয়ান বাজারের আড়তগুলো ডুবে যায়Ñ যা সোমবার পর্যন্ত ছিল। এখন যেসব এলাকা থেকে বেশি সবজি আসে সেসব এলাকার ফসলি জমিগুলো আক্রান্ত হওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে। সোমবার ট্রাক ঢোকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও জেলাগুলোতে পণ্যের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য দাম কিছুটা বেড়েছে।
তিনি বলেন, কারওয়ান বাজারে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে বিক্রেতারা ঠিকমতো পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না এবং ক্রেতাও কমে গেছে। তবে দিন ভালো হলেই এ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে জানান তিনি।
সবজির পাশাপাশি দাম বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির। তিন-চার দিন আগেও ব্রয়লার মুরগির মাংস বিক্রি হয়েছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকার মধ্যে। তবে এই পরিস্থিতিতে দাম বাড়িয়ে বিক্রেতারা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দামে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করছেন। সোনালি মুরগির দামও খানিকটা বেড়ে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।
বিক্রেতাদের জানান, বৃষ্টির কারণে খামারিরা মুরগি ঠিকমতো সরবরাহ করতে পারছেন না, আর পথিমধ্যে পরিবহনে বাড়তি সময় লাগায় খরচও বেড়ে গেছে।