জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মহান শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এবং আন্দোলনের দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে একপাশে সরিয়ে রেখে বর্তমান সরকারের উদাসীন আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং তৎকালীন গণহত্যার বিচার সংশ্লিষ্ট বিশেষ সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি সরকারের তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাইয়ের গণআন্দোলন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের স্বৈরশাসনবিরোধী লড়াইয়ের একটি চূড়ান্ত ফসল।
এই দীর্ঘ সময়ে যারা গুম হয়েছেন, খুন হয়েছেন কিংবা বুকের ভেতর ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে বুলেটের স্প্লিন্টার নিয়ে পঙ্গু হয়ে আজীবন ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন, তাদেরকে ভুলে যাওয়া নিজেদের আত্মার সঙ্গে চরম ও নিকৃষ্টতম বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। মুখে মুখে জুলাইয়ের গল্প ফেঁদে বাস্তবে যারা ক্ষমতার ফসল ঘরে তুলেছেন, তারা আজ পঙ্গু জুলাই যোদ্ধাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে বাধ্য করছেন।
সংসদে ড. শফিকুর রহমান সময়ের বণ্টন নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি সরকারি দল ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের ইতিহাসের চরম বিকৃতির জবাব দেন। তিনি বলেন, সরকারি দলের কোনো কোনো দায়িত্বশীল সদস্য ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জোটের ইতিহাস না জেনে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞের মতো অসত্য তথ্য উপস্থাপন করছেন, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
সাবেক ও বর্তমান সরকারের ভূমিকার একটি চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাংককের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা সদ্য সাবেক সরকারের আমলেই নেওয়া হয়েছিল। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের এত বড় বড় কথা বলার পরও আজ অসংখ্য আহত ও পঙ্গু মানুষ চিকিৎসার জন্য মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
তিনি বর্তমান সরকারকে দোষারোপের নোংরা ও সস্তা রাজনীতি পরিহার করে অতি দ্রুত এসব আহত ও বীর যোদ্ধাদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেওয়ার জোরালো দাবি জানান। প্রয়োজনে এই বীর সন্তানদের পুনর্বাসনের জন্য দেশের সব সংসদ সদস্যের সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা কর্তন করার সাহসী প্রস্তাব দিয়ে তিনি নিজের সংসদীয় সুযোগ-সুবিধা প্রথম বাতিল করার প্রকাশ্য ঘোষণা দেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা সরকারের চরম সমন্বয়হীনতা ও ধীরগতির তীব্র সমালোচনা করে জুলাই জাদুঘর এখনো বন্ধ রাখার কারণ জানতে চান। তিনি বলেন, জুলাই জাদুঘরের কাজ শেষ হয়নি, এই ঠুনকো অজুহাতে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় স্মারক কেন মাসের পর মাস বন্ধ রাখা হয়েছে তা জনগণের কাছে অস্পষ্ট।
সংস্কার কাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এটি চলতে চলতেই মানুষের জন্য জাদুঘর উন্মুক্ত করা যেত। তাই কালবিলম্ব না করে অবিলম্বে জুলাই জাদুঘরটি জনগণের জন্য খুলে দেওয়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সরাসরি তাগিদ দেন।
একই সঙ্গে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মতো সংবেদনশীল ও অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিগত পাঁচ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এই প্রতিষ্ঠানটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও গতিশীল ও প্রাণবন্ত করার দাবি জানান।
বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও গণহত্যাকারীদের বিষয়ে বর্তমান সরকারের আপোষকামী বা নমনীয় সুরের কড়া সমালোচনা করে ড. শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচারে কোনো ধরনের টালবাহানা, ধীরগতি বা গড়িমসি এ দেশের কোটি জনতা কখনোই বরদাশত করবে না।
যদি ক্ষমতার কোনো অপশক্তির কারণে এই ঐতিহাসিক বিচারে কোনো অবহেলা বা গড়িমসি করা হয়, তবে হাশরের ময়দানে তিনি নিজে এই গাফেলদের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান বাদী হিসেবে দাঁড়াবেন। তবে বিচারের নামে যেন নির্দোষ কোনো মানুষের ওপর অন্যায় ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক অবিচার করা না হয়, সেদিকেও তিনি কঠোর সতর্কবার্তা দেন।
একই সঙ্গে পতিত স্বৈরাচারের দোসর ও রক্তপিপাসু সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় সরকারের মেরুদণ্ডহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যে সমস্ত ফ্যাসিস্ট মিডিয়া তৎকালীন স্বৈরাচারকে আরও বেশি উগ্র ও রক্তপিপাসু হতে ইন্ধন জুগিয়েছিল, তারা আজ আবার ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্য ময়দানে নেমে চরম রাষ্ট্রদ্রোহী কথাবার্তা বলছে। কোন অদৃশ্য শক্তির আশকারা ও খুঁটির জোরে এই রাষ্ট্রদ্রোহীরা এত সাহস পাচ্ছে এবং সরকারের আসল দুর্বলতাটা ঠিক কোথায়, তা অবিলম্বে ১৮ কোটি মানুষের সামনে পরিষ্কার করার জন্য তিনি দাবি জানান।
দেশের সীমান্তে চলমান অস্থিরতা ও প্রতিবেশী দেশের উস্কানিমূলক তৎপরতার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের নতজানু ও রহস্যজনক নীরবতার তীব্র সমালোচনা করে ড. শফিকুর রহমান বলেন, সীমান্তে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে, অথচ সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এখনও পর্যন্ত দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে কোনো কড়া ও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয়নি।
এ সময় তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং এই দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটির সার্বভৌমত্ব ও প্রতিটি বালুকণার পাহারাদারি দেশের ১৮ কোটি জনগণ এক হয়ে বুক দিয়ে করবে।
বক্তব্যের শেষ অংশে ঐতিহাসিক ১৪ জুলাইকে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর দিন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি সরকার ও বিরোধী দলের সব দায়িত্বশীল নেতাদের কথা বলার ক্ষেত্রে আরও বেশি সংযত ও কেয়ারফুল হওয়ার অনুরোধ করেন।
অতি সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর একটি বিতর্কিত মন্তব্যের পর দুঃখ প্রকাশ করাকে স্বাগত জানালেও ভবিষ্যতে যাতে সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির মুখ থেকে আন্দোলনের চেতনা ক্ষুণ্নকারী কোনো অসতর্ক মন্তব্য না আসে, সে ব্যাপারে সতর্ক করেন।
সবশেষে একটি নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে ও অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য অতীতে অনুষ্ঠিত হওয়া গণভোটের রায়কে পাস কাটিয়ে কেন বারবার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার বিষয়ে তিনি বলেন, জনগণের ভোটের সঠিক মূল্যায়ন ও তাদের রায়কে সম্মান না জানালে এ দেশের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান অচিরেই ধ্বংসের মুখোমুখি হবে এবং এর পুরো দায়ভার বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে।