ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেল দুই জেলার যমজ ৩ বোন

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

একটি ঘর। একটি পড়ার টেবিল। তিনটি চেয়ার। পাশাপাশি বসে তিনটি ছোট্ট মুখ। কখনো গণিতের অঙ্কে ব্যস্ত, কখনো বাংলা কবিতা মুখস্থ করছে, আবার কখনো একজন আরেকজনকে বুঝিয়ে দিচ্ছে কঠিন কোনো পাঠ। বাইরে বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসে, কিন্তু তাদের বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ থামে না। সেই ছোট্ট পড়ার টেবিল থেকেই শুরু হয়েছিল তিনটি স্বপ্নের যাত্রা। আর সেই যাত্রারই অনন্য গন্তব্য তিনজনের হাতেই এখন ট্যালেন্টপুলের বৃত্তির সনদ।

বরগুনার শিক্ষাঙ্গনে বিরল এ কৃতিত্বের গল্পের নায়িকা যমজ তিন বোন অন্বেষা হালদার, অঙ্কিতা হালদার ও অনুষ্কা হালদার। ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বরগুনার গৌরীচন্না হাইসংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এই তিন বোন ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে।

প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিতে কীর্তি গড়েছে আরও একটি পরিবারের তিন যমজ বোন। তারা হচ্ছে কুড়িগ্রামের তাবিয়া রহমান, তাহিয়া রহমান ও তাকিয়া রহমান। তাহিয়া ও তাকিয়া কুড়িগ্রাম সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে এবং তাবিয়া অর্জুনডারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। তাদের বাবা তারিকুর রহমান তারিক কুড়িগ্রাম জেলা জজ আদালতের আইনজীবী। মা শাহিনা আক্তার গৃহিণী।

অন্বেষা-অঙ্কিতা-অনুষ্কা: ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বরগুনার গৌরীচন্না হাইসংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দারুণ সাফল্য অর্জন করেছে। বিদ্যালয়ের ১২ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনই বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে সাতজন ট্যালেন্টপুলে এবং চারজন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি অর্জন করেছে। তবে সব অর্জনের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এই স্কুল থেকে যমজ তিন বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভের ঘটনা।

বরগুনার দক্ষিণ মনসাতলী গ্রামের অন্বেষা-অঙ্কিতা-অনুষ্কার বাবা চিন্ময় হালদার বরগুনার গৌরীচন্না নওয়াব সলিমুল্লাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মা কাজলী রানী গৌরীচন্না হাইসংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোটবেলা থেকেই তিন বোনের মধ্যে ছিল এক অসাধারণ বোঝাপড়া। একজন কোনো বিষয় আগে বুঝে ফেললে অন্য দুজনকে বুঝিয়ে দিত। পরীক্ষার আগে তারা একে অপরকে প্রশ্ন করত ভুল ধরিয়ে দিত, আবার একসঙ্গে অনুশীলনও করত।

যমজ তিন কন্যার বাবা চিন্ময় হালদার বলেন, ‘ওদের কখনো পড়তে বসানোর জন্য চাপ দিতে হয়নি। নিজেরাই সময়মতো বই নিয়ে বসত। শুধু মুখস্থ নয়, প্রতিটি বিষয় বুঝে শেখার চেষ্টা করত। একজন কোনো বিষয়ে ভালো করলে অন্য দুজন আরও ভালো করার চেষ্টা করত। আবার কেউ কোনো বিষয় না বুঝলে অন্য দুজন বুঝিয়ে দিত। এভাবেই ওরা একে অপরের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হয়ে উঠেছে।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যমজ তিন বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন আমাদের বিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে ১২ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনের বৃত্তি অর্জন আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি।’

তাবিয়া-তাহিয়া-তাকিয়া কুড়িগ্রামের গর্ব : তাবিয়া রহমান, তাহিয়া রহমান ও তাকিয়া রহমানের পরিবার ও শিক্ষকরা জানান, ছোটবেলা থেকেই তিন বোন অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত-শিষ্ট ও শৃঙ্খলাপরায়ণ। নিয়মিত অধ্যয়ন, শিক্ষকদের নির্দেশনা মেনে চলা এবং শেখার প্রতি প্রবল আগ্রহই তাদের এই সাফল্যের মূল ভিত্তি।

বাবা তারিকুর রহমান বলেন, ‘মহান আল্লাহর কাছে তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, উত্তম জ্ঞান ও নৈতিক চরিত্র গঠনের জন্য দোয়া কামনা করছি। পাশাপাশি সবার কাছেও দোয়া চাই।’ কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, একই পরিবারের তিন জমজ বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন শুধু তাদের পরিবারের গর্বই নয়, কুড়িগ্রামের শিক্ষা অঙ্গনের জন্যও একটি অনন্য ও অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত। তাদের এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদেরও মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত