অনুপ্রেরণার আর্জেন্টিনা, নিঃশব্দ ইংল্যান্ড

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলো শুধু ফুটবল নয়, ইতিহাস, আবেগ আর প্রতিদ্বন্দ্বিতারও গল্প বলে। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ঠিক তেমনই একটি ম্যাচ। এই দুই দলের মুখোমুখি লড়াই মানেই সমর্থকদের মধ্যে অন্যরকম উত্তেজনা। ১৯৮৬ সালের ‘হ্যান্ড অব গড’, সেই বিশ্বকাপের অবিস্মরণীয় গোল, ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি সব মিলিয়ে মাঠের ৯০ মিনিটের বাইরেও এই ম্যাচের আলাদা এক আবেদন রয়েছে।

বর্তমান আর্জেন্টিনা দলকে দেখলে আমার প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো দলটির সবচেয়ে বড় ভরসা এখনো লিওনেল মেসি। তিনি শুধু একজন অধিনায়ক নন, একজন গোলমেশিন, একজন অনুপ্রেরণার নাম। বড় ম্যাচে তিনি যেকোনো মুহূর্তে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। তবে এটাও সত্য, আগের আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে বর্তমান দলের কিছু পার্থক্য রয়েছে। একসময় অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া কিংবা পাওলো দিবালার মতো খেলোয়াড়রা মেসিকে দারুণভাবে সহায়তা করতেন। এখন সেই ধরনের সৃজনশীল সমর্থন আগের মতো নিয়মিত দেখা যায় না। হুলিয়ান আলভারেজ নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পুরো আক্রমণভাগকে একা টেনে নেওয়া সহজ নয়। মিডফিল্ডেও আগের মতো সেই নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য চোখে পড়ে না। তবে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের দলীয় সমন্বয়। তারা একে অপরের জন্য খেলতে জানে, যা বড় টুর্নামেন্টে অনেক সময় ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডকে আমি অনেক পরিণত একটি দল হিসেবে দেখছি। অতীতে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে আসার আগে অনেক বড় বড় কথা বলত। মাইকেল ওয়েন, ওয়েন রুনি কিংবা আরও অনেক তারকার ওপর বিশাল প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু বর্তমান ইংল্যান্ড একেবারেই ভিন্ন। তারা খুব বেশি কথা বলছে না, প্রচারের আলোয় থাকারও চেষ্টা করছে না। বরং নিঃশব্দে নিজেদের কাজটা করে যাচ্ছে এবং ধারাবাহিকভাবে জিতছে।

হ্যারি কেইন এখনো তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তার গোল করার ক্ষমতা যেমন অসাধারণ, তেমনি সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করতেও তিনি সমান দক্ষ। মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে ইংল্যান্ডের সমন্বয়ও যথেষ্ট ভালো। তারা ইউরোপীয় ফুটবলের শৃঙ্খলা ও গতি বজায় রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে লং বলেও দ্রুত আক্রমণে যেতে পারে। এই কৌশলগত বৈচিত্র্য তাদের বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ করে তুলেছে।

এই ম্যাচে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে লাতিন আমেরিকার ফুটবল দর্শন বনাম ইউরোপীয় ফুটবলের কৌশল। আর্জেন্টিনা সাধারণত টেকনিক, ছোট ছোট পাস এবং আবেগ দিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। অন্যদিকে ইংল্যান্ড গতি, শারীরিক সক্ষমতা ও সংগঠিত ফুটবলের ওপর বেশি নির্ভরশীল। যে দল প্রতিপক্ষের এই ভিন্ন ধরনের ফুটবলকে দ্রুত রপ্ত করতে পারবে এবং ম্যাচের ছন্দ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে।

মেসিকে থামানোর জন্য ইংল্যান্ড নিশ্চয়ই বিশেষ পরিকল্পনা করবে। তাকে কড়া মার্কিংয়ে রাখা হবে, মাঝমাঠে জায়গা কম দেওয়া হবে। কিন্তু মেসির মতো খেলোয়াড়কে পুরো ম্যাচে আটকে রাখা কখনোই সহজ নয়। আবার আর্জেন্টিনাকেও হ্যারি কেইনকে সামলানোর জন্য বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। দুই দলের তারকারা যদি নিজেদের সেরাটা খেলতে পারেন, তাহলে ম্যাচটি হতে পারে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা লড়াই।

এটি ‘ডু অর ডাই’ ম্যাচ। এখানে শারীরিক লড়াইও থাকবে, আবার অসাধারণ টেকনিকও দেখা যাবে। সমর্থকরা হয়তো একদিকে কঠিন ট্যাকল দেখবেন, অন্যদিকে চোখজুড়ানো ফুটবলও উপভোগ করবেন। ম্যাচটি ৯০ মিনিটে শেষ নাও হতে পারে। অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকার পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, যে দল প্রথম গোল করবে, মানসিকভাবে তারাই অনেকটা এগিয়ে যাবে।

সবশেষে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বলি। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১০ সালে স্পেন, ২০১৮ সালে ফ্রান্স এবং ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা শিরোপা জিতেছে। এবার আমার মনে হচ্ছে ইতিহাস নতুন মোড় নিতে পারে। প্রায় ৬০ বছর ধরে বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষায় থাকা ইংল্যান্ড এবার নিঃশব্দেই নিজেদের স্বপ্নের খুব কাছে চলে এসেছে। তাই আমার বিশ্বাস, যদি তারা এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে দীর্ঘ ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইংল্যান্ডই বিশ্বকাপের ট্রফি ঘরে তুলতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত