এবার কি ইরানের দ্বীপ দখলে নামছে মার্কিন সেনা?

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৫ এএম

সম্প্রতি ইরানের কেশম, কিশ ও আবু মুসা দ্বীপসহ পারস্য উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসে একের পর এক হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এই হামলার পর আবারও একটি বড় প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী কি এবার ইরানের ভূখণ্ড দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে?

যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাসের মাথায় গত মার্চ মাসে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, ইরান যে দ্বীপটি দিয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে, সেই ‌‘খার্গ দ্বীপ’ দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। ১৭ জুন উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক সই করলে সেই জল্পনা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু গত সোমবার (১৩ জুলাই) ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই দ্বীপ দখলের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাকে এটি নিশ্চিত করতে পারব না। কারণ যদি আমি তা বলি, তবে সেটি হবে একটি বোকামি।’

কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা গবেষণা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল জাজিরাকে জানান, কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা, শক্তিশালী বিমান ও নৌবাহিনীর সহায়তায় তারা ইরানের যেকোনো ছোট দ্বীপ দখল করে নিতে পারে।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক নাদের হাশেমি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান সামরিক পরাশক্তি হওয়ায় তাদের লজিস্টিক সক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আসল প্রশ্ন হলো, এর জন্য ওয়াশিংটনকে কতটা মূল্য চুকাতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দ্বীপ সাময়িকভাবে দখল করা আর তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কেশম দ্বীপটি মূল ভূখণ্ডের একদম কাছে হওয়ায় এটি ধরে রাখা খুবই কঠিন হবে। অন্যদিকে, হেনগামের মতো ছোট দ্বীপ সহজে দখল করা গেলেও তা ইরানের আর্টিলারি, ড্রোন ও মিসাইলের আওতায় থাকবে।

আন্দ্রেয়াস ক্রিগ হিসাব করে দেখিয়েছেন, এই ধরনের একটি সীমিত অভিযানেও প্রাথমিকভাবে অন্তত ৫ থেকে ১০ হাজার বিমান সেনা, প্রকৌশলী, লজিস্টিক ও মেডিকেল টিম প্রয়োজন হবে। দ্বীপের সংখ্যা বাড়লে সেনাসংখ্যাও দ্রুত বাড়াতে হবে। কিন্তু এই সেনারা সরাসরি ইরানি বাহিনীর কামানের মুখে পড়বে। ফলে রসদবাহী জাহাজ ও হেলিকপ্টারগুলোকে প্রতিনিয়ত ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হবে। ইরান হয়তো সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপটি পুনরুদ্ধার করবে না, বরং তারা প্রতিনিয়ত হামলা চালিয়ে মার্কিন বাহিনীর জন্য এটিকে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল ফাঁদে পরিণত করবে।

অধ্যাপক নাদের হাশেমি মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ, বিশেষ করে খার্গ দ্বীপ দখলের ঝুঁকি নেবে না। কারণ এতে প্রচুর মার্কিন সেনার প্রাণহানি ঘটতে পারে, যা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এবং খোদ ট্রাম্পের ‘মাগা’ সমর্থকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করবে। অনেকেই একে ইরাক যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখবেন। তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র পুরো ইরান দখল করার ক্ষমতা রাখলেও, তা আরব বিশ্বের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নষ্ট করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে পুরোপুরি অস্থিতিশীল করে তুলবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো দ্বীপে নামার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) মোবাইল রাডার, উপকূলীয় মিসাইল ব্যাটারি ও ড্রোন ঘাঁটিগুলো স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। কারণ এগুলো বেশিরভাগই মূল ভূখণ্ডের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে ইরানের এই দ্বীপগুলোর প্রয়োজন নেই; তারা মূল ভূখণ্ড থেকেই ড্রোন ও মিসাইল ছুড়তে পারে। ফলে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি নিরাপদ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিশাল উপকূলীয় এলাকা দখল করতে হবে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলযুদ্ধের সূচনা করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের বড় স্থলযুদ্ধের সম্ভাবনা একেবারেই কম।

যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের কোনো দ্বীপ দখল করে, তবে তেহরান একে চূড়ান্ত যুদ্ধ হিসেবে দেখবে। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে মাইন পুঁতে দিতে পারে এবং পারস্য উপসাগরের জ্বালানি অবকাঠামো ও মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক হামলা চালাতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বীমা প্রিমিয়াম হু হু করে বাড়বে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এই রুট পরিহার করবে। এছাড়া সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোও এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হতে চাইবে না, কারণ তারা নিজেরা ইরানি হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে ভয় পায়।

বিশ্লেষকদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হলো, ইরানের দ্বীপ দখল করা সামরিক প্রচারণার জন্য একটি জাঁকজমকপূর্ণ ছবি এনে দিতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটি নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইকে একটি দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপান্তর করবে। আর ওয়াশিংটন ঠিক যে বড় স্থলযুদ্ধটি এড়াতে চাইছে, এটি তাদের সেই যুদ্ধের দিকেই টেনে নিয়ে যাবে।

সূত্র: আল-জাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত