হাজার কোটি টাকার ক্ষতি সংকটে লাখো মানুষ

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৯ এএম

টানা অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে গেছে পুরো চট্টগ্রাম জেলা। স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্যোগে জেলার ১৫টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা মারাত্মকভাবে প্লাবিত হয়েছিল। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে জেলার মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, কৃষি, স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, সড়ক ও জনপদ এবং শিক্ষা খাতসহ গ্রামীণ অবকাঠামোগুলো অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। প্রাথমিক দাপ্তরিক হিসাব অনুযায়ী, এসব প্রধান খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইতিমধ্যে কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষতির আর্থিক অঙ্ক আরও ভারী হচ্ছে। বানের পানি নামলেও ঘরবাড়ি, ক্ষেতের ফসল ও উপার্জনের মাধ্যম হারিয়ে মানবিক বিপর্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছেন জেলার অন্তত লাখো মানুষ। দুর্গত এলাকাগুলোতে সুপেয় পানি, খাদ্য ও বাসস্থানের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বন্যায় চট্টগ্রাম জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এ দিকে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিতে সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই তথ্য জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেসব পরিবারের ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের তালিকা তৈরি করে নতুন ঘর নির্মাণ এবং মেরামতের জন্য সরকারি তহবিল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢেউটিন ও নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা হবে। বন্যাকবলিত প্রান্তিক ও অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর টেকসই জীবিকায়ন নিশ্চিত করতে ভিজিডি, ভিজিএফ ও কর্মসৃজন কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি করা হবে। একই সঙ্গে সহজ শর্তে কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণসুবিধা প্রদান করা হবে।

এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও বাঁধগুলো কেবল মেরামতই করা হবে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যতের বন্যা মোকাবিলার উপযোগী করে আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তিতে পুনর্নির্মাণ করা হবে বলেও জানান তিনি। কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতিও চরম আকার ধারণ করেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১৫ হাজার ৯৮৬ হেক্টর ফসলি জমি সম্পূর্ণ ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে আর্থিক লোকসান ও সংকটের মুখে পড়েছেন জেলার ১ লাখ ২২ হাজার ৬৮৫ জন কৃষক। প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ আবাদ এবং গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষেত।

জেলায় আউশ আবাদের ৯ হাজার ১১৮ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে, যার কারণে বিপাকে পড়েছেন ৪৯ হাজার ২০০ জন আউশ চাষি। অন্যদিকে, ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ৫৯ হাজার ৭০ জন সবজিচাষি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এ ছাড়াও, আগামী আমন মৌসুমের জন্য কৃষকদের তৈরি করা ৯৬১ হেক্টর বীজতলা নষ্ট হওয়ায় ১৪ হাজার ৪১৫ জন কৃষক নতুন করে বীজ সংকটে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতি ও আর্থিক লোকসানের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম জোনের মোট ২১২ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ৩৪ দশমিক শূন্য ৯ কি.মি, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৩২ দশমিক ৯৫ কি.মি এবং জেলা মহাসড়ক ১৪৫ দশমিক ৯১ কি.মি বন্যার কবলে পড়েছে।

এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রাথমিক জরুরি বা স্বল্পমেয়াদি মেরামতের জন্য ৪৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা হলেও, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই মেরামতের জন্য মোট ৩৩২ কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের অনুমান করা হয়েছে চট্টগ্রামে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের জন্য ১০৭ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।      

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস বলেন, চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে ১২ হাজার ১১০টি সরকারি ও ব্যক্তিগত নলকূপ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৭ হাজার ৮৫১টি নলকূপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৫ হাজার ৬৯৪টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ওপরও এই বন্যার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রামের ৫টি উপজেলার অন্তত ৫৫টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় সর্বোচ্চ ৩০টি, বাঁশখালীতে ১৬টি, চন্দনাইশে ৫টি, লোহাগাড়ায় ২টি এবং বোয়ালখালীতে ২টি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাতকানিয়ার ৩০টি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ৪টি সাব-সেন্টার বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় অন্তত ৫৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উপকরণ নষ্ট হয়ে গেছে।

মৎস্য খাতে ১৪৫ কোটি টাকার ক্ষতি, ভেসে গেছে সাড়ে ১৬ হাজার পুকুর-ঘের : বন্যার পানিতে জেলার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে মৎস্য খাতে। জেলার ১৫টি উপজেলার প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার পুকুর, দিঘি ও ঘের বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এতে প্রাথমিকভাবে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এসব জলাশয় থেকে ৫ হাজার ৪১৫ দশমিক শূন্য ৬ টন ফিন ফিশ ও চিংড়ি ভেসে গেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তৈরি করা প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ অনুযায়ী, ভেসে যাওয়া মাছের কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪৩ কোটি ৪৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া পুকুর, ঘের ও সøুইসগেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে আরও ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। উপজেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী উপজেলায়, যেখানে ক্ষতির পরিমাণ ৫১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এরপরই রয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, বন্যায় মৎস্য খাতের ক্ষয়ক্ষতির এই হিসাবটি প্রাথমিক। মাঠ পর্যায় থেকে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করার কাজ চলছে।

বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম জেলায় প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটি ৬ লাখ ৮১ হাজার ১৪০ টাকা। জেলার ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৩টি গরু, ৭৫১টি মহিষ, ৭৭ হাজার ৯৩৩টি ছাগল, ১০ হাজার ৩৬৪টি ভেড়া, ১৯ লাখ ১৭ হাজার ২৩৫টি মুরগি এবং ২৭ হাজার ৭২০টি হাঁস আক্রান্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে ও দুর্যোগকালীন অসুস্থতায় জেলায় ৩৯টি গরু, ৯৫টি ছাগল, ৪২টি ভেড়া এবং ১৪ লাখ ২ হাজার ১৩৭টি মুরগি ও ১ হাজার ৩০০টি হাঁস মারা গেছে। পাশাপাশি জেলার প্রায় ১ হাজার ১ একর চারণভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যার কারণে জেলার হাজার হাজার বেসরকারি খামারও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ২১৮টি খামারের ৩২ হাজার ৭৭৫টি গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১২ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ৫ হাজার ৬৭৪টি হাঁস-মুরগির খামারের ৭ লাখ ২৭ হাজার ২২৩টি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার আর্থিক মূল্য ১৭ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত