দাবানল নিয়েও বাজি!

বিপর্যয়কে বাজারে পরিণত করছে ‘প্রেডিকশন মার্কেট’

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের আলতাডেনা এলাকায় ছড়িয়ে পড়া ইটন ফায়ারে ১৯ জনের মৃত্যু হয় এবং পুড়ে যায় হাজার হাজার স্থাপনা। আগুনে ধ্বংস হওয়া ভবনগুলোর একটি ছিল কাইটলিন ট্রুডো নামে একজনের দাদার বাড়ি। ট্রুডো ক্যালিফোর্নিয়ার অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্ট্রালে্র একজন জলবায়ু বিজ্ঞানী । তিনি বলেন, মুহূর্তেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তার পরিবারের দীর্ঘদিনের ঘর, হারিয়ে যায় সবকিছু।

যখন তার পরিবার এই ভয়াবহ ক্ষতির ধাক্কা সামলাচ্ছিল, তখন অন্য একদল মানুষ সেই বিপর্যয় থেকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ খুঁজছিল।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লস অ্যাঞ্জেলেসে ভয়াবহ দাবানল চলাকালে জনপ্রিয় প্রেডিকশন মার্কেট প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেটে অনেকে অর্থের বিনিময়ে পূর্বাভাস বা বাজি ধরছিলেন, আগুন কত একর জমি গ্রাস করবে, কোন এলাকায় পৌঁছাবে এবং কখন তা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

জলবায়ু বিজ্ঞানী ট্রুডো এই প্রবণতাকে 'ভয়াবহ ডিস্টোপিয়ান' বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেন, আগুন লাগানো এখন শুধু সহজ নয়, এখন এর সঙ্গে সম্ভাব্য আর্থিক লাভের বিষয়টিও যুক্ত হতে পারে। পোড়া দাদার বাড়ি দেখতে প্রথমবার আলতাডেনায় যাওয়ার সময় সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

বিপর্যয়কে বাণিজ্যে পরিণত করছে প্রেডিকশন মার্কেট

পলিমার্কেট একটি দ্রুত বেড়ে ওঠা বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্পের অংশ, যেখানে মানুষ ভবিষ্যতের প্রায় যেকোনো ঘটনা নিয়ে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ফুটবল ম্যাচের ফলাফল, নির্বাচন, এমনকি ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতটি পোস্ট করবেন, এসব বিষয়ও।

বর্তমানে কিছু প্রেডিকশন মার্কেটে দাবানল ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো নিয়েও লেনদেন হচ্ছে। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তাদের আশঙ্কা, এই ধরনের বাজার মানুষের মধ্যে আগুন লাগানোর মতো অপরাধে প্রণোদনা তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি এটি দাবানলের ভয়াবহ মানবিক ক্ষতিকে নিছক একটি সংখ্যার খেলায় পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

ট্রুডো বলেন, 'আমি উদ্বিগ্ন যে এসব বাজার মানুষকে এমনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করতে পারে, যেন এসব ঘটনা ভিডিও গেমের মতো, বাস্তব জীবনের ভয়াবহ বিপর্যয় নয়।'

পলিমার্কেটের দাবি: এটি তথ্যের উৎস

তবে পলিমার্কেট কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের প্ল্যাটফর্ম দুর্যোগের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হিসেবে কাজ করে।

প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন, 'মানুষ বিশ্লেষণের জন্য সংবাদমাধ্যমে যায়, আর তথ্যের জন্য পলিমার্কেটে আসে।'

তিনি আরও বলেন, 'ঝুঁকি সম্পর্কে আমরা সচেতন। তবে এসব বাজার বন্ধ করে দিলে কোনো বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না; বরং যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে।'

পলিমার্কেট নিজেদের কার্যক্রমকে জুয়া হিসেবে বিবেচনা করে না। তাদের ভাষায়, ব্যবহারকারীরা ভবিষ্যতের ঘটনার ফলাফল নিয়ে ‘লেনদেন’ করেন এবং তারা একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়।

প্ল্যাটফর্মে সাধারণত এমন প্রশ্ন তৈরি করা হয়, যার উত্তর হয় ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। ব্যবহারকারীরা ০ থেকে ১ ডলারের মধ্যে মূল্যে কোনো একটি ফলাফলের শেয়ার কিনতে পারেন। যেমন, কোনো ফলাফলের শেয়ার যদি ৬৫ সেন্টে বিক্রি হয়, তার অর্থ বাজার মনে করছে সেই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ৬৫ শতাংশ।

দাবানলের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি কেন?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হারিকেন বা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনায় দাবানলের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি, কারণ মানুষ সরাসরি এতে প্রভাব ফেলতে পারে।

লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির সাবেক অগ্নিসংযোগ তদন্তকারী এড নর্ডস্কগ বলেন, 'যে কেউ একটি দাবানল শুরু করতে পারে।'

তিনি জানান, সাধারণত তিনি এমন ঝুঁকিকে খুব বড় করে দেখাতেন না, কারণ অগ্নিসংযোগকারী মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তবে নিজের অভিজ্ঞতায় তিনি জুয়া আসক্তি ও অগ্নিসংযোগের মধ্যে একটি সম্পর্ক লক্ষ্য করেছেন।

তিনি বলেন, 'অবাক করার মতো সংখ্যক অগ্নিসংযোগকারী প্রতিদিন যেসব ক্যাসিনোতে যেতেন, সেগুলোর আশপাশেই আগুন লাগাতেন।'

যদিও এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণালব্ধ তথ্য নেই, নর্ডস্কগ মনে করেন, এই ধরনের বাজার 'উদ্বেগজনক সম্ভাবনা' তৈরি করছে।

শুধু আগুন লাগানো নয়, আগুন বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কাও

বিশেষজ্ঞদের আরেকটি উদ্বেগ হলো, কেউ আগুন লাগাবে না, কিন্তু আগুন নিয়ন্ত্রণে বাধা দিতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কোনো অগ্নিনির্বাপক কর্মী বেশি জমি পুড়লে লাভবান হওয়ার সুযোগ পেলে আগুন নেভানোর কাজে বিলম্ব করতে পারেন।

সম্প্রতি ফ্রান্সের প্যারিসের চার্লস দ্য গল বিমানবন্দরের তাপমাত্রা সেন্সরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়ে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ওই তথ্য পলিমার্কেটের লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছিল এবং অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে কিছু ব্যক্তি বড় অঙ্কের অর্থ পেয়েছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন জল্পনাও ছড়ায় যে কেউ হয়তো হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করে সেন্সর গরম করেছিল। যদিও এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা মেটিও-ফ্রান্স এ ঘটনায় তথ্য ব্যবস্থায় কারসাজির অভিযোগে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছে।

পলিমার্কেট জানিয়েছে, তারা অবৈধ কার্যক্রম শনাক্ত করতে নজরদারি চালায় এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির কারণে অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব।

নৈতিক প্রশ্নও বড় হয়ে উঠছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের মৃত্যু বা ক্ষতির সম্ভাবনার ওপর অর্থ উপার্জনের বিষয়টি নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ।

সান্তা ক্লারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও নৈতিকতা বিভাগের পরিচালক অ্যান স্কিট বলেন, 'কারও সম্ভাব্য মৃত্যু বা ক্ষতির ওপর বাজি ধরা মানবজীবনের মূল্যকে ছোট করে দেখায়।'

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের ফরেনসিক সাইকোলজির অধ্যাপক থেরেসা গ্যানন বলেন, এটি আগুনের ভয়াবহতাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে এবং মানুষকে এর প্রকৃত প্রভাব থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

ইতিবাচক সম্ভাবনাও দেখছেন কেউ কেউ

তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সঠিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে প্রেডিকশন মার্কেট জলবায়ু ঝুঁকি পূর্বাভাসে সহায়ক হতে পারে।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট স্কুলের অর্থনীতিবিদ কিম কাইভান্তোর গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরিচালিত প্রেডিকশন মার্কেট জলবায়ু সংক্রান্ত পূর্বাভাসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে দাবানলের পূর্বাভাসে এসব বাজার কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

স্যান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটির ওয়াইল্ডফায়ার গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ক্রেইগ বি. ক্লেমেন্টস বলেন, 'আগুন ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। শুধু বাজারভিত্তিক পূর্বাভাস দিয়ে এর উন্নতি হবে কি না, তা পরিষ্কার নয়।'

ক্যালিফোর্নিয়া বন ও অগ্নি সুরক্ষা বিভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগ জানিয়েছে, তারা দাবানল পূর্বাভাসে কোনো বাজি বা প্রেডিকশন মার্কেটের তথ্য ব্যবহার করে না।

নতুন ধরনের ঝুঁকি ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন

কিছু সমর্থক মনে করেন, প্রেডিকশন মার্কেট ভবিষ্যতে বিমার বিকল্প হিসেবেও কাজ করতে পারে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় দাবানলের ঝুঁকির কারণে বিমা কোম্পানিগুলো সরে যাচ্ছে।

তবে ট্রুডো এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, এটি সহজেই এমন মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে, যারা নিজেদের বাড়ির জন্য বিমা করতে পারছেন না।

অন্যদিকে, কিছু গবেষক মনে করেন, এসব বাজার মানুষের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণাও বদলাতে পারে। কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের স্নায়ুবিজ্ঞানী মোরান সার্ফ বলেন, জলবায়ু অস্বীকারকারী কেউ যদি জলবায়ু বিপর্যয়ের ওপর বাজি ধরে অর্থ উপার্জন করেন, তাহলে তিনি ধীরে ধীরে বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে শুরু করতে পারেন।

তবে তিনি বর্তমান প্রেডিকশন মার্কেট ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সমর্থন করেন না। তার ভাষায়, 'এটি এখনো অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষেত্র। তারা মূলত যেখানে অর্থ আছে, সেদিকেই ছুটছে।'

কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এই শিল্প দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যেই মানুষ ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয় নিয়েও অর্থ বিনিয়োগ করে চলেছে।

গত বছর প্যালিসেডস ফায়ার নিয়ে পলিমার্কেটের একটি লেনদেনের মন্তব্য বিভাগে এক ব্যবহারকারী লিখেছিলেন, এটা মজার ছিল। সবাইকে ধন্যবাদ। পরেরবার আবার দেখা হবে!'

এই মন্তব্যই দেখিয়ে দেয়, কারও কাছে যা বিপর্যয় ও মৃত্যুর কারণ, অন্য কারও কাছে তা হয়ে উঠছে অর্থ উপার্জনের আরেকটি সুযোগ।

 

  • সূত্র: সিএনএন
×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত