ফাইনালে কৌশল ও ধৈর্যের লড়াই

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০২:০০ এএম

আর্জেন্টিনা ও স্পেন দুই দলই আধুনিক ফুটবলের দুই ভিন্ন ধাঁচের শক্তিশালী প্রতিনিধি। তবে একটি জায়গায় তাদের মিল আছে। দুই দলই রক্ষণকে ভিত্তি করে খেলে। প্রয়োজন অনুযায়ী ৪-৪-২ ফরমেশনে শুরু করে, আবার ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে পরিবর্তনও আনে। তাই এই ফাইনালকে আমি গোলবন্যার ম্যাচের চেয়ে কৌশল, ধৈর্য ও মানসিক শক্তির লড়াই হিসেবেই দেখছি।

আর্জেন্টিনার শেষ কয়েকটি ম্যাচ আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছি। দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তারা অযথা শক্তি ক্ষয় করে না। একবার এগিয়ে গেলে ম্যাচজুড়ে অবিরাম আক্রমণে যায় না। বরং বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে খেলতে দেয়, পরিস্থিতি বোঝে এবং শেষ ১০ থেকে ১৫ মিনিটে আবার গতি বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে। এই পরিকল্পনাই তাদের ধারাবাহিক সাফল্যের অন্যতম কারণ বলে আমার মনে হয়েছে।

লিওনেল স্কালোনির আরেকটি বড় গুণ হলো, তিনি ম্যাচের প্রয়োজন বুঝে আক্রমণভাগে পরিবর্তন আনতে দ্বিধা করেন না। অনেক সময় একসঙ্গে একাধিক আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নামিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেন। এই কৌশল কাজে লাগলে ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারে। তবে সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, সেই সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতাও থাকতে হবে। কারণ বড় ম্যাচে একটি মিসই অনেক সময় শিরোপা হাতছাড়া করে দেয়।

অন্যদিকে বিশ্বকাপে স্পেনের শুরুটা হয়তো খুব একটা চোখে পড়ার মতো ছিল না। দীর্ঘ ইউরোপীয় মৌসুমের ক্লান্তির প্রভাব প্রথম দিকের ম্যাচগুলোতে কিছুটা ছিল। কিন্তু নকআউট পর্বে তারা নিজেদের প্রকৃত সামর্থ্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে শেষ ম্যাচে তাদের পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। তারা শুধু জয় পায়নি, পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল।

স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সমন্বিত প্রেসিং। প্রতিপক্ষ কোথা থেকে আক্রমণ শুরু করবে, সেটাই তারা আগে থেকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়ে ওঠার আগেই প্রতিপক্ষকে থামিয়ে দেয়। এ কারণে বিশ্বের সেরা আক্রমণভাগও তাদের বিপক্ষে স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে পারে না। এই স্প্যানিশ দলের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র লামিন ইয়ামাল। বয়স কম হলেও তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ড্রিবলিং আমাকে অনেক সময় তরুণ মেসির কথা মনে করিয়ে দেয়। এক মুহূর্তেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য তার রয়েছে। পাশাপাশি ফেরান তোরেস, দানি ওলমো, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি ও রদ্রিরাও যেকোনো সময় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। তাই আর্জেন্টিনার প্রথম কাজ হবে এই মিডফিল্ডকে ছন্দে খেলতে না দেওয়া। রদ্রিকে স্বাধীনভাবে বল বিতরণ করতে দেওয়া যাবে না। পেদ্রির জায়গা কমিয়ে দিতে হবে। ইয়ামালকে ডাবল মার্কিংয়ে রাখতে হবে। তাহলেই স্পেনের আক্রমণের ধার অনেকটাই কমে যাবে।

আর্জেন্টিনার জন্য মাঝমাঠের লড়াইটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি বলের দখল ধরে রাখতে পারে এবং নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ধীরগতিতে ম্যাচ পরিচালনা করতে পারে, তাহলে শেষ দিকে আবারও তাদের চেনা আক্রমণাত্মক রূপ দেখা যেতে পারে। কিন্তু শুরু থেকেই যদি স্পেনের উচ্চ প্রেসিংয়ের চাপে পড়ে যায়, তাহলে ম্যাচ কঠিন হয়ে উঠবে।

আমার কাছে এই ফাইনালের সবচেয়ে বড় বিষয় টেম্পারামেন্ট। এখানে শুধু ভালো ফুটবল খেললেই হবে না, স্নায়ুর চাপও সামলাতে হবে। যে দল কম ভুল করবে এবং নিজেদের পরিকল্পনায় শেষ পর্যন্ত অটল থাকবে, তারাই ট্রফির সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছাবে। আমি আশা করছি, দুই দলই সতর্কভাবে ম্যাচ শুরু করবে। প্রথম ৩০ মিনিটে কেউ অযথা ঝুঁকি নেবে না। এরপর ধীরে ধীরে খেলার গতি বাড়বে। শেষ ১৫ মিনিটেই হয়তো নির্ধারিত হবে শিরোপার ভাগ্য। কারণ আর্জেন্টিনা শেষ সময়ে আক্রমণের গতি বাড়াতে অভ্যস্ত, আর স্পেন পুরো ম্যাচজুড়ে একই তীব্রতায় খেলতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত