বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের মূল লড়াই থেকে ছিটকে পড়া দুটি দলের জন্য ‘তৃতীয় স্থাননির্ধারণী ম্যাচ’ সব সময়ই এক অদ্ভুত মানসিক চাপের নাম। সেমিফাইনালের হতাশাকে পেছনে ফেলে নতুন করে মাঠে নামা যেকোনো ফুটবলারের জন্যই কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। তাই ভক্ত-সমর্থকদের অনেকের কাছেই এই ম্যাচটি কেবল একটি ‘সান্ত¡নার লড়াই’ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ফুটবলের বিশাল ক্যানভাসে ব্রোঞ্জ পদক জয়ী হওয়ার মাহাত্ম্য যে অনেক বেশি, তা খেলোয়াড়দের জেদ আর মাঠের তীব্র লড়াই দেখলেই বোঝা যায়।
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসর থেকে শুরু হওয়া এই পদক লড়াইয়ের ঐতিহ্য আজও টিকে আছে। ১৯৫০ সাল বাদে ১৯৩৪ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিটি আসরেই এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিফার হিসাব অনুযায়ী, এটি কেবল সম্প্রচার বা রাজস্ব বাড়াতে আয়োজন করা নয়, বরং পরাজিত সেমিফাইনালিস্টদের জন্য মর্যাদার একটি শেষ সুযোগ।
বিশ্ব ফুটবলের পদক তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, জার্মানি চারবার এই ব্রোঞ্জ পদক জিতে সবার শীর্ষে অবস্থান করছে। তাদের ঠিক পেছনেই দুইবার করে পদক জয়ের তালিকায় রয়েছে ব্রাজিল, ফ্রান্স, সুইডেন ও ক্রোয়েশিয়ার মতো ফুটবল পরাশক্তিরা। এবারের মায়ামি স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের সামনে সুযোগ রয়েছে তৃতীয়বারের মতো ব্রোঞ্জ পদক জিতে এককভাবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসার। অন্যদিকে, ১৯৬৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের সামনে রয়েছে এক আক্ষেপ মোচনের সুযোগ। ইতিহাসে দুবার চতুর্থ স্থান পাওয়া ইংলিশরা এবার প্রথমবার এই পদক জয়ের নেশায় মরিয়া।
কোচদের জন্য এই ম্যাচটি এক অদ্ভুত দ্বৈরথ। ফাইনাল স্বপ্নভঙ্গের পর খেলোয়াড়দের পুনরায় উজ্জীবিত করা যেকোনো কোচের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম কিংবা ইংল্যান্ডের টমাস টুখেল উভয়ই স্বীকার করেছেন যে, বিশ্বকাপের মতো আসরে এই ম্যাচের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়াটা সহজ নয়। তবে ইতিহাস বলছে, মাঠের এই লড়াই অনেক সময় কিংবদন্তিদের ব্যক্তিগত অর্জনের সাক্ষী হয়ে থাকে। ১৯৫৮ সালে জুঁস ফন্তেইন এই ম্যাচেই ৪ গোল করে এক বিশ্বকাপে ১৩ গোলের অসামান্য রেকর্ড গড়েছিলেন, যা আজও অজেয়। তাই গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়ে থাকা এমবাপ্পে-কেইনদের জন্য এটিই নিজেকে শেষবারের মতো মেলে ধরার আরও একটি সুযোগ।
ম্যাচটি নিয়ে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মনে ফাইনালের আক্ষেপ থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু পেশাদার ফুটবলে জয়ী হওয়ার জেদ সব সময়ের। ফ্রান্সের জন্য এটি একটি বর্ণিল যুগের বিদায়ী অধ্যায়, আর ইংল্যান্ডের জন্য সাফল্যের নতুন সোপান। ম্যাচটি স্রেফ সান্ত¡না নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের শেষ রণাঙ্গন। যারা এই ম্যাচেও নিজেদের উজাড় করে দেয়, তারাই পদকের ঝনঝনানি নিয়ে ঘরে ফেরে। আর যারা অবহেলা করে, তাদের জন্য অপেক্ষায় থাকে কেবল শূন্য হাত আর দীর্ঘশ্বাস।