বার্সেলোনার লা মাসিয়ার এক বিকেল। চিকন গড়নের, লাজুক এক কিশোর বল পায়ে জাদু দেখাচ্ছে। কোচেরা বিস্মিত, সতীর্থরা মুগ্ধ। গ্যালারিতে বসে থাকা অনেকেই তখন হয়তো ভাবছিলেন, এই ছেলেটিই একদিন স্পেনের ফুটবলের হাল ধরবে। দেশটির ফুটবল ফেডারেশনও সেই স্বপ্ন দেখেছিল। তারা চেয়েছিল, আর্জেন্টিনা থেকে উঠে আসা বিস্ময়বালক একদিন লা রোহার জার্সি গায়ে খেলুক। কিন্তু দুই দশক পর ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যে দেশ তাকে বিশ্বসেরাদের কাতারে পৌঁছে দিয়েছে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সেই দেশেরই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন লিওনেল মেসি।
আগামীকাল বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। এই লড়াইকে অন্য সব ফাইনাল থেকে আলাদা করে তুলেছেন মেসি। স্পেনের বর্তমান স্কোয়াডের অনেকের কাছে তিনি কেবল প্রতিপক্ষ নন, তাদের শৈশবের নায়ক, অনুপ্রেরণা, আদর্শও। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালের প্রসঙ্গে স্মৃতি সাগরে ডুব দিয়ে হাসলেন মেসি, ‘আমি তাদের অনেকের বিপক্ষেই খেলেছি এবং এখনো তাদের খেলা অনুসরণ করি। তাদের কয়েকজন বার্সেলোনায় খেলে। এটি এমন একটি ক্লাব যেটিকে আমি এখনো ভালোবাসি এবং অনুসরণ করি।’
প্রায় ১৫ বছর বার্সেলোনার হৃদস্পন্দন ছিলেন মেসি। ক্লাবটির ফুটবল দর্শন যেন তার পায়ের ছোঁয়াতেই পূর্ণতা পেয়েছিল। স্পেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার হয়েও তিনি কখনো স্পেনের ফুটবলার হয়ে ওঠেননি। ক্যারিয়ারের শুরুতেই স্পেনের ফুটবল ফেডারেশন তাকে জাতীয় দলের হয়ে খেলানোর চেষ্টা করে। তখন মেসি ঠিক মেসি হয়েও ওঠেননি। সবে ১২ বছর বয়সে রোসারিও ছেড়ে বার্সেলোনায় আসেন তিনি। স্প্যানিশ ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন। পরে স্প্যানিশ নাগরিকত্বও গ্রহণ করেন। স্পেনে জমি, বাড়ি সবই হয়েছে কিন্তু নিজের পরিচয় বদলাননি মেসি।
একবার মেসি বলেছিলেন, ‘অনেকে জানতে চায়, আমার স্প্যানিশ উচ্চারণ নেই কেন। কারণটা সহজ। আমি আমার দেশের সঙ্গে নিজের পরিচয় হারাতে চাই না। আমাকে স্পেনের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু আমি সব সময় বলেছি, আমি শুধু আর্জেন্টিনার হয়েই খেলব।’
স্পেনের অনেক ফুটবলার বড় হয়েছেন মেসিকে দেখে। লামিন ইয়ামাল জন্মের কয়েক মাস পর একটি বিজ্ঞাপনের ফটোশুটে মেসির কোলে ওঠেন। সে ছবি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। দানি ওলমোর শোবার ঘরে এখনো টাঙানো মেসির ছবি। মিকেল ওয়ারিয়াসাবাল নিয়মিত মেসির ভিডিও দেখেন, ‘মেসিকে দেখা মানে শিক্ষা নেওয়া। কিন্তু যতবার দেখি, ততবারই মুগ্ধ হয়ে যাই।’ কিন্তু আগামীকালের বিশ্বকাপ ফাইনালে সেই মুগ্ধতা ভুলে যেতে হবে তাদের। নিজেদের নায়ককেই থামাতে হবে। কারণ, মেসিকে থামানো মানেই স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা।
শুধু খেলোয়াড় নয়, দুই দলের কোচদের গল্পও যেন একই সুতোয় বাঁধা। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি প্রায় এক দশক স্পেনে কাটান। খেলেছেন দেপোর্তিভো লা কোরুনিয়ায়। স্পেনেই পরিচয় হয়েছে তার স্ত্রীর সঙ্গে। কোচিংয়ের প্রথম পাঠও নিয়েছেন বর্তমান স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে। স্কালোনি নিজেই স্বীকার করেছেন, কোচ হিসেবে গড়ে ওঠার পথে লা ফুয়েন্তের অবদান তার জীবনে কতটা।
তবে মাঠে নামলে সম্পর্কের জায়গা থাকে না। স্পেন এসেছে প্রায় নিখুঁত ফুটবল খেলে। বিশ্বকাপের সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে। দ্রুত পাস, নিয়ন্ত্রিত আক্রমণ, সংগঠিত রক্ষণ মিলিয়ে তারা যেন একটি পরিপূর্ণ দলে পরিণত হয়েছে। সেমিফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং তার ফ্রান্সকে নিষ্প্রভ করে রাখে স্পেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার পথ বেশ কঠিন ছিল। নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই তারা বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ফিরে এসেছে। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত হার না মানার এক অদম্য মানসিকতা তৈরি করেছে স্কালোনির দল।