ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সংগীত বিভাগের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অভিযোগ উঠেছে, ইসলামিক স্টাডিজে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে সংগীত বিষয়ে শুধু পিএইচডি ডিগ্রির ভিত্তিতে তিনি প্রভাষক পদে নিয়োগ পান; নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সংগীত বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স বাধ্যতামূলক ছিল। এ অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কেবল সংগীত বিভাগ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বেশ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ জমা পড়েছে প্রশাসনে। সেগুলোও পর্যায়ক্রমে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সংগীত বিভাগের যার বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে তিনি ড. মো. জিয়াউর রহমান (সাইম রানা)। বর্তমানে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তিনি ঢাবির ইসলামিক স্টাডিজে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করলেও সংগীত বিভাগ থেকে এমফিল ও পিএইচডি করেন। পিএইচডি চলাকালে তিনি জাপানে সংগীত বিষয়ে এক বছর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। এরপর সংগীত বিভাগে প্রায় চার বছর খ-কালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি সংগীত গবেষক হিসেবে পরিচিত।
অভিযোগ প্রকাশ, ২০১৫ সালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের আমলে সংগীত বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সংগীত বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিকে বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “প্রভাষক পদে প্রার্থীদের এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ/সিজিপিএ স্কেল ৫.০০ এর মধ্যে ন্যূনতম ৪.২৫সহ সংগীত বিষয়ে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রি পরীক্ষায় ন্যূনতম প্রথম শ্রেণি অথবা সিজিপিএ স্কেল ৪.০০ এর মধ্যে ৩.৫০ প্রাপ্ত হইতে হইবে। অন্যান্য যোগ্যতা সমান থাকিলে উচ্চতর ডিগ্রিধারীগণকে অগ্রাধিকার প্রদান করা যাইতে পারে।”
অভিযোগ প্রসঙ্গে ড. সাইম রানা বলেন, ‘আমি অনার্স-মাস্টার্স সংগীতে না করলেও অনার্সে সংগীতকে সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসেবে পড়েছি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে এমফিল করি এবং সেখান থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করি। পিএইচডি চলাকালে জাপানে সংগীত বিষয়ে একটি স্কলারশিপ নিয়ে এক বছর উচ্চতর প্রশিক্ষণও নিয়েছি। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা ছিল, অনার্স ও মাস্টার্সের শর্ত থাকলেও উচ্চতর ডিগ্রি থাকলে সেই শর্ত শিথিলযোগ্য। সেই বিধান অনুযায়ী আমি আবেদন করি। বিভাগ, সংশ্লিষ্ট কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আমার নিয়োগ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অনেকে আমার কল্যাণ চান না। তাই তারা ১১-১২ বছর পর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করছেন।’
এ বিষয়ে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকারকে আহ্বায়ক করে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই চলছে। আপাতত বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষে রিপোর্ট জমা হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
অন্যান্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও তদন্ত সংগীত বিভাগ ছাড়াও আরও কয়েকটি বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ, ২০১৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগ, ২০১৪ সালে বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ইসলামিক স্টাডিজ ও ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগে নিয়োগে নির্ধারিত যোগ্যতা বা মেধাক্রম উপেক্ষার অভিযোগ জমা পড়েছে কর্তৃপক্ষের কাছে।
এ ছাড়া ২০১৬ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল এবং ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত সংখ্যার চেয়ে বেশি শিক্ষক নিয়োগ, ২০১০ সালে চারুকলা অনুষদের সাতটি বিভাগে ১৭ জন প্রভাষক নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়েছে এমন অভিযোগে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয় এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ও তদন্ত প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে শুধু ভালো ফলাফল নয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণা সক্ষমতা ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে মেধাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং কেবল ১৫-২০ মিনিটের মৌখিক সাক্ষাৎকারের ওপর নির্ভর না করে গবেষণা, পাঠদানের পরিকল্পনা ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নকেও নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ করা উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা পর্যালোচনা করবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্তও আসতে পারে।