আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যাদের ওপর আস্থা রাখার কথা, তাদের বিরুদ্ধেই এবার উঠেছে কোটি টাকার মাদক চালান গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা থানায় মাদকবিরোধী অভিযানের নাটক সাজিয়ে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে প্রাইভেটকারসহ বিপুল পরিমাণ মাদকের চালান।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যকে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুলিশ। অভিযুক্তরা হলেন ওই থানার এসআই তুহিন ও রিমন মিয়া এবং এএসআই আব্দুল হাকিম ও লুৎফর রহমান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৭ জুলাই দুপুরে গোপন খবরের ভিত্তিতে হাতীবান্ধার বোর্ডের হাট বাজারের পূর্বপাশে এক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর বাড়িতে অভিযান চালান হাতীবান্ধা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তুহিন ও রিমন, এবং সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আব্দুল হাকিম ও লুৎফর রহমান।
অভিযানে একটি সাদা প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়। তবে অদ্ভুতভাবে আলামতগুলো থানায় না নিয়ে কয়েক কিলোমিটার দূরে ভেলাগুড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে নিয়ে রাখা হয়।
বিকাল ৩টা থেকে শুরু হয় দীর্ঘ দরকষাকষি। ইউপি কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজে সাদা পোশাকে অভিযুক্ত চার পুলিশ কর্মকর্তাকে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও সহযোগীদের নিয়ে গোপন বৈঠকে দেখা যায়। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রাতভর আলোচনা শেষে ১০ লাখ টাকার রফাদফায় গাড়ি ও মাদকের চালান ছেড়ে দেওয়া হয়।
ভিডিও ফুটেজ প্রকাশের ভয়ে এএসআই আব্দুল হাকিম এক স্থানীয় ইউপি কর্মচারীর মোবাইল ফোন থেকে সিসিটিভি মনিটরিং অ্যাপ জোরপূর্বক মুছে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর পরদিনই (১৮ জুলাই) ভবানীপুর গ্রামে একই কায়দায় ভিত্তিহীন অভিযানে গেলে গ্রামবাসীর তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় পুলিশ দল। স্থানীয়দের দাবি, এই চার কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন।
অভিযোগের ব্যাপারে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত এসআই তুহিন ঘটনাটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং প্রতিবেদন না করার আকুতি জানান। তিনি বলেন, 'বাদ দেন তো ভাইজান, এগুলো ছোট ঘটনা। এগুলো নিয়ে লেখালেখি করলে আমাদের ক্ষতি হবে। আসেন, আমরা সবাই বসে একটা সুরাহা করি।'
হাতীবান্ধা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুজ্জামান সরকার জানান, প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযুক্ত চার কর্মকর্তা এসআই তুহিন, এসআই রিমন, এএসআই আব্দুল হাকিম ও এএসআই লুৎফর রহমানকে বৃহস্পতিবার থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অভিযোগটি বৃহস্পতিবার তার নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় থাকবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশের সদস্য হলেও কোনো ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরপরই কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।