সব হারিয়েও সবুজের প্রেমে বুঁদ ‘গাছমামা’ রায়হান

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:৩০ পিএম

দুপুরের প্রখর রোদ। খোয়াই নদীর পাড়ে ঘামে ভিজে এক ব্যক্তি তালগাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করছেন। হাতে গ্লাভস, পাশে দা আর কোদাল। কাছে যেতেই মুখভরা হাসি।

হবিগঞ্জ শহরে ছোট-বড় প্রায় সবাই তাকে ‘গাছমামা’ নামে চেনে। তার প্রকৃত নাম মো. রায়হান মিয়া। কিন্তু মানুষ যেন তার আসল নাম ভুলেই গেছে। গাছের প্রতি অদম্য ভালোবাসাই তাকে দিয়েছে এই নতুন পরিচয়। মধ্যপ্রাচ্যে জীবিকার তাগিদে গিয়ে বাসার ছাদে ধানের চারা লাগিয়েছেন, ফলদ ও সবজির বাগান করেছেন। তার এমন কাণ্ড দেখে বিস্মিত হয়েছেন আরবরাও।

বানিয়াচং উপজেলার দাসপাড়া গ্রামের আব্দুল হাসিম ও রাবেয়া খাতুন দম্পতির সন্তান মো. রায়হান মিয়া। শৈশব থেকেই গাছ ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী। মাঠ থেকে ধানের চারা এনে বাড়ির উঠোনে রোপণ করতেন। ১৯৮৫ সালে ডিসেম্বরে জীবিকার সন্ধানে কাতারে পাড়ি জমান। দীর্ঘ ২৭ বছর প্রবাসে কাটালেও গাছের প্রতি তার ভালোবাসা একটুও কমেনি। যে ভবনে থাকতেন, তার ছাদেই গড়ে তুলেছিলেন সবুজের ছোট্ট এক রাজ্য।

২০১২ সালে জুন মাসে প্রবাস থেকে ফিরে সংসার গড়েছিলেন। কিন্তু সেই সংসার টেকেনি। এরই মধ্যে ছোট ভাই তার জমিজমা বিক্রি করে দেন। বিদেশে আয়ের টাকা বিলিয়েছেন সবাইর মাঝে। জীবনের একের পর এক আঘাতে ভেঙে না পড়ে তিনি বেছে নেন সবুজের পথ। এক কথায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেন বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায়।

হবিগঞ্জ-বানিয়াচং, হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ সড়কসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে আজ যে তাল, আম, জাম, কাঁঠালসহ অসংখ্য গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোর বেশির ভাগ তার হাতে রোপণ করা।

খোয়াই নদীর পাড়ে বসে কথা বলতে বলতে রায়হান জানান, জীবনে কতটি গাছ লাগিয়েছেন তার হিসাব নেই। তবে তার বিশ্বাস, সংখ্যাটি অর্ধ লাখ কম নয়।

কেন গাছ লাগানোকে জীবনের ব্রত বানিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পৃথিবীতে নানা ধর্ম, নানা বিধান আছে। কিন্তু কোনো ধর্মেই গাছ লাগাতে নিষেধ করা হয়নি। গাছ মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু। মানুষকে খাদ্য দেয়, ছায়া দেয়, বিশুদ্ধ বাতাস দেয়, পরিবেশকে সুন্দর রাখে। তাই গাছ লাগানোর চেয়ে বড় কাজ আমার কাছে আর কিছু নেই।

তিনি বলেন, আমি স্বপ্নেও দেখি গাছ লাগাচ্ছি। দেখি, ছোট্ট চারাগুলো বড় হয়ে ফুল-ফলে ভরে গেছে। রাস্তার পাশে কোনো গাছ হেলে পড়লে সেটিকে সোজা করে দিতে ইচ্ছে করে।

সব হারানোর কষ্টের চেয়েও একটি চারা নষ্ট হওয়ার কষ্ট বেশি এ কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, গরু-ছাগল গাছ খেয়ে ফেললে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু মানুষ কেন বিনা কারণে গাছ ভেঙে ফেলে, তা বুঝি না। তখন খুব কষ্ট হয়, চোখে পানি চলে আসে।

২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর রাস্তার পাশে অসংখ্য তালগাছ লাগিয়ে আসছেন তিনি। কিন্তু বেশিরভাগ গাছই টিকিয়ে রাখতে পারেননি। কেউ তুলে নিয়ে গেছে, কেউ কেটে ফেলেছে। আক্ষেপ করে বলেন, একই জায়গায় তিনবার তালগাছ লাগিয়েও মানুষের হাত থেকে বাঁচাতে পারিনি।

সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন মো. রায়হান মিয়া। শিক্ষা অনুরাগীও তিনি। কাতারে থাকাকালীন সেখানে গড়ে উঠা বাংলাদেশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিনি ডোনার মেম্বার। তার মতে আমার সন্তান না পড়ুক, এ প্রতিষ্ঠানে তো আমার দেশের শিক্ষার্থীরাই পড়বে। এটাই আমার গর্ব।

হবিগঞ্জের মানুষের কাছে মো. রায়হান মিয়া শুধু একজন মানুষ নন; তিনি এক টুকরো সবুজ স্বপ্ন, এক চলমান পরিবেশ আন্দোলনের নাম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত