বাংলাদেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কোলঘেঁষা খুলনার কয়রা উপজেলা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনপদগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীতে লবণাক্ততার বিস্তার এবং নিরাপদ পানির সংকট- এসব দুর্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে এখানকার নারীদের জীবনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণাক্ত পানি দীর্ঘদিন ব্যবহার ও পান করার কারণে কয়রার নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, জরায়ুজনিত রোগ, চর্মরোগ, কিডনি জটিলতা এবং গর্ভকালীন নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, চিকিৎসক ও গবেষকদের ভাষ্য, ঘূর্ণিঝড় আইলা, আম্পান, ইয়াস ও রিমালের মতো দুর্যোগের পর কয়রার বিস্তীর্ণ এলাকায় নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা আরও বেড়েছে। ফলে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। অনেক পরিবার এখনও বৃষ্টির পানি, পুকুরের সংরক্ষিত পানি কিংবা দূরের মিঠাপানির উৎসের ওপর নির্ভরশীল।
নারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি ব্যবহার ও পান করার ফলে নারীদের মধ্যে জরায়ু সংক্রমণ, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, সাদা স্রাব এবং অন্যান্য প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্লাম্পসিয়া, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত এবং অপরিণত শিশুর জন্মের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কয়রার বিভিন্ন ইউনিয়নের অনেক নারীকে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে হয়। এতে একদিকে যেমন শারীরিক পরিশ্রম বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনা, রান্নাবান্না ও অন্যান্য গৃহস্থালি দায়িত্বও তাদেরই বহন করতে হচ্ছে। জলবায়ুজনিত কারণে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক পুরুষ কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাওয়ায় সেই দায়িত্ব আরও বেড়েছে।
কয়রা উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা তাসলিমা খাতুন বলেন, লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে ত্বকে চর্মরোগ ও চুলের ক্ষতি হচ্ছে। অনেক নারী গর্ভপাতসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। কয়রার নারীদের অভিজ্ঞতাও এর সঙ্গে মিল রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
কয়রা ও সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার বহু নারী ও শিশু জীবিকার তাগিদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লবণাক্ত পানিতে দাঁড়িয়ে চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করেন। চিকিৎসকদের মতে, এ কারণে চর্মরোগ, সংক্রমণ এবং বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুলনা বিভাগের ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ পরিবারকে সুপেয় পানি সংগ্রহে ৩০ মিনিটের বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। একই প্রতিবেদনে দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে খুলনায় নবজাতক মৃত্যুহার সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ততাপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় জরায়ুসংক্রান্ত রোগের হার তুলনামূলক বেশি। নিরাপদ পানি ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার উপকরণের অভাবে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় অনেক নারীকে অল্প বয়সেই জরায়ু অপসারণের মতো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হচ্ছে।
উপজেলার গর্ভবতী নারীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি গ্রহণের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত এবং অপরিণত শিশুর জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে দৈনন্দিন কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে চর্মরোগের প্রবণতাও বেশি দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়রাসহ একই উপকূলীয় পরিবেশের কারণে এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি এখানকার নারীদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
বিশ্বব্যাংকের ‘An Unsustainable Life: The Impact of Heat on Health and the Economy of Bangladesh’ শীর্ষক গবেষণায়ও বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্র পরিবেশে বসবাসকারী নারীদের গর্ভপাতের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
কয়রা উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রেজাউল করিম রাজিব বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সুপেয় পানির অভাব এবং লবণাক্ত পানির ব্যবহারের কারণে নারীরা নানা স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগছেন। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবার নজরদারি ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়রার মতো সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা, নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, নিয়মিত মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনা, মাসিক স্বাস্থ্যবিধির উপকরণ নিশ্চিত করা এবং পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে এই নীরব স্বাস্থ্যসংকট আরও গভীর হবে।